ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেই কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের অবসান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার মধ্যেই বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় এমন সতর্কবার্তা দেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, কোনো দেশ তার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর কিংবা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়ার সুযোগ দিলে সেই দেশকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে। ইরানের সহায়তাকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘অভূতপূর্ব মাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’ তৈরির হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই হুমকি এমন এক সময়ে এলো, যখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের প্রভাবে ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। পাশাপাশি সংঘাতের আঁচ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য বাজারেও।

বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বিশ্ববাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারির আগে বিশ্বের সমুদ্রপথে বাণিজ্যিকভাবে পরিবহন করা মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত। ফলে সেখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ধীরে ধীরে সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই দফা যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রথমটি এপ্রিলে এবং দ্বিতীয়টি জুনে ঘোষণা করা হয়। তবে দুটিই অল্প সময়ের মধ্যে ভেঙে পড়ে। এর মধ্যে ইসরায়েলও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যুদ্ধ থেকে সরে এসেছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতেই ট্রাম্প এমন বক্তব্য দিচ্ছেন। রেকর্ড পরিমাণ সরকারি ঋণ ও উচ্চ সুদের হারসহ নানা অর্থনৈতিক সমস্যায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই চাপে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের নীতি শুধু বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নয়, বিভিন্ন দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্যও হুমকি। ওয়াশিংটন একই নীতি অব্যাহত রাখলে আরও ব্যর্থতার মুখে পড়বে এবং এর ফলে ইরানও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও দূরে সরে যাবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য, কূটনৈতিক যোগাযোগ কিংবা শান্তি আলোচনায় ভূমিকা রাখা দেশগুলোর মধ্যেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কয়েকটি দেশ অতীতে ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগ বা মধ্যস্থতায় ভূমিকা রেখেছে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত মঙ্গলবার জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম, ব্যবসায়িক লেনদেন ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করা হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বক্তব্যের পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। মন্ত্রণালয় দাবি করেছিল, ইরান থেকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে এবং সেগুলো সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। তবে ইরান এ প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরান থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে চীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন।

ফলে চীনের বিরুদ্ধেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে বিরল খনিজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা রয়েছে। চীন সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করলে মার্কিন শিল্প ও অর্থনীতিতেও তার বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের। মঙ্গলবার আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান আলোচনায় প্রস্তুত থাকলেও আলোচনাকে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছে না।

মোখবেরের দাবি, সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানের সংকল্প ভাঙা সম্ভব নয়।

তবে আলোচনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যে কিছুটা অসঙ্গতি দেখা গেছে। মঙ্গলবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। অথচ এর এক দিন আগে তাঁর জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার জানিয়েছিলেন, আলোচনা এখনো চলছে এবং তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ‘সম্ভবত আরও জোরালো’।

ইরানের সঙ্গে নতুন একটি পারমাণবিক চুক্তি করতে চান ট্রাম্প। তাঁর লক্ষ্য, ইরানের মজুত করা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং দেশটির পারমাণবিক জ্বালানি ও গবেষণা কার্যক্রমের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে যে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে গিয়েছিল, নতুন চুক্তির মাধ্যমে তার পরিবর্তে একটি নতুন কাঠামো তৈরি করতে চায় ওয়াশিংটন। অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো লক্ষ্য তাদের নেই।

সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে চীনসহ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার উদ্যোগ নিলে তা শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থাতেও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version