জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি শিক্ষা খাত। প্রতিবছর উন্নয়ন বাজেটে শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেই অর্থের বড় অংশই ব্যয় করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের চিত্রে শিক্ষা খাতের এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ। বিভাগটির বাস্তবায়নের হার মাত্র ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি বরাদ্দ অর্থবছর শেষে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

গত অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ২৩টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। ফলে প্রায় ১ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা অব্যয়িত থেকে গেছে।

শিক্ষা খাতের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। ৭২টি প্রকল্পের বিপরীতে বিভাগটির বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। বছর শেষে বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৬৬ শতাংশে। ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। ফলে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা অব্যয়িত রয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন হার তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি হলেও সেখানেও বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করা যায়নি। সাতটি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬১ কোটি টাকা। বছর শেষে বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ৮৭ শতাংশে। অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা অব্যয়িত রয়ে গেছে।

তিনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভাগের হিসাব একত্র করলে দেখা যায়, শুধু এসব খাতেই ৭ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার মতো উন্নয়ন বরাদ্দ অর্থবছর শেষে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। অথচ দেশের শিক্ষা অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন রয়েছে।

আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সার্বিক এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এমন ধীরগতির বাস্তবায়নের মধ্যেও শিক্ষা খাতের কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অবস্থান ছিল সবচেয়ে নিচের দিকে।

শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই শিক্ষা খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরাদ্দকৃত অর্থ যথাসময়ে ছাড়, প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা, কঠোর মনিটরিং এবং সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণও জরুরি। এসব জায়গায় দুর্বলতা থাকলে বড় বাজেটও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রমে শিক্ষা খাতের এই পিছিয়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। গত কয়েক বছর ধরেই এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, ব্যয়ের বড় অংশ অবকাঠামো খাতে গেলেও শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের হার আরও কম।

তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি, অনিয়ম, দুর্বল মনিটরিং, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং প্রকল্প নির্বাচনে অগ্রাধিকার নির্ধারণের দুর্বলতার কারণে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্পের অগ্রগতি যথাযথভাবে তদারক করা এবং সময়মতো অর্থ ছাড় নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

শিক্ষা খাতকে জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবায়নের এই চিত্র সরকারের অগ্রাধিকার ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ শুধু বাজেটের কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষাসুবিধা নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।

বিশেষ করে যখন হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরও অর্থবছর শেষে তা অব্যয়িত থেকে যাচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে- বরাদ্দের অর্থ কেন সময়মতো শিক্ষার্থীদের কাজে আসছে না? প্রকল্প বাস্তবায়নে কোথায় বাধা এবং এর জন্য দায়ী কে- তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব শুধু বাজেটে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা নয়; সেই অর্থ যথাসময়ে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় করে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের কাছে এর সুফল পৌঁছে দেওয়াও সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।

আইএমইডির তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মোট বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা এবং এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়নের হার ছিল প্রায় ৭৯ শতাংশ। সেই তুলনায় শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগের বাস্তবায়ন হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version