আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা ব্যালট বাক্সে নয়, বরং ব্যালট বাক্সে যাওয়ার আগের পুরো প্রক্রিয়ায়। কে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে, বিরোধীরা কতটা স্বাধীনভাবে প্রচার করতে পারছে, গণমাধ্যম কতটা মুক্ত, ভোটার ভয় বা চাপমুক্তভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে এবং ক্ষমতাসীনদের পরাজিত করার বাস্তব সুযোগ আছে কিনা এসব প্রশ্নের উত্তরই বলে দেয় একটি নির্বাচন কতটা প্রতিযোগিতামূলক।

রাশিয়া ও চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এই জায়গাতেই পশ্চিমা উদার গণতন্ত্র থেকে আলাদা। সেখানে নির্বাচন আছে, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আছে, ভোটও আছে; কিন্তু ক্ষমতার প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়ার ক্ষেত্রে ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্য এবং বিরোধী রাজনীতির ওপর নানা বিধিনিষেধ এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। চীনে তো কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোই রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি। অর্থাৎ নির্বাচন এবং গণতন্ত্র এক জিনিস নয়।

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে সংকুচিত করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরও রাশিয়া পূর্ণাঙ্গ বহুদলীয় উদার গণতন্ত্রের স্থায়ী রূপ অর্জন করতে পারেনি। আজকের রাশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই একটি ধারাবাহিকতা।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হওয়া উচিত ভোট হয়েছে কিনা, শুধু তা নয়; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা উন্মুক্ত ছিল। যে নির্বাচনে বিরোধী মতের কার্যকর অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে যায়, সেখানে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হচ্ছে ক্ষমতাসীনকে ভোট দিয়ে রাখা নয়, প্রয়োজনে ভোট দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার বাস্তব অধিকার।

অন্যদিকে ইউরোপের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে আমরা ভিন্ন একটি প্রবণতা দেখছি। জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, সীমান্ত নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগের কারণে ডানঘেঁষা রাজনৈতিক দলগুলোর জনসমর্থন বেড়েছে। তবে ইউরোপের ‘ডানপন্থা’কে দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অতিসরলীকরণ হবে।

ইউরোপীয় ডানপন্থী দলগুলোর মধ্যেও বিস্তর পার্থক্য আছে। কেউ অভিবাসন কমাতে চায়, কেউ জাতীয় সংস্কৃতি ও পরিচয়ের ওপর জোর দেয়, কেউ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করতে চায়, আবার কেউ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে তাদের কিছু অবস্থান নিয়ে নাগরিক অধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার ও বৈষম্যের প্রশ্নে তীব্র বিতর্কও রয়েছে। তাই ‘ডানপন্থী’ মানেই খ্রিস্টান মৌলবাদী এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি ইউরোপের প্রতিটি ডানপন্থী আন্দোলনকে উদার গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রক্ষক হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। মূল বিষয়টি অন্যত্র।

ইউরোপের জনগণের একটি অংশ মনে করছে, দ্রুত অভিবাসন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ তাদের পরিচিত সামাজিক কাঠামোকে বদলে দিচ্ছে। এই উদ্বেগ বাস্তব কি না, তার মাত্রা কতটা তা নিয়ে রাজনৈতিক ও একাডেমিক বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এই উদ্বেগ যে ইউরোপের নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। এখানেই গণতন্ত্রের শক্তি।

জনগণ যদি অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন চায়, ভোটের মাধ্যমে সেটি প্রকাশ করতে পারে। কেউ যদি সীমান্ত কঠোর করার পক্ষে থাকে, সে সেই রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে ভোট দিতে পারে। আবার কেউ বহুসাংস্কৃতিক সমাজের পক্ষে থাকলে তারও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অধিকার আছে। গণতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় রাখার ব্যবস্থা নয়; বরং ভিন্ন মতের শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা।

তাই ইউরোপে ডানপন্থার উত্থানকে শুধু ‘ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন বাস্তবতার প্রতি অবিচার, তেমনি অভিবাসনবিরোধী প্রতিটি বক্তব্যকে ষড়যন্ত্র বা ঘৃণার রাজনীতি হিসেবে চিহ্নিত করাও সমস্যার সমাধান নয়। একইভাবে মুসলিম অভিবাসীদের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে একক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা গোপন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ নয়। অপরাধ, উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কঠোর হবে এটি একটি বিষয়; আর একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

ইউরোপে ইসলাম নিষিদ্ধ হবে কিংবা ব্রিটেন ও ফ্রান্সে মুসলিম অভিবাসীদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি ছাড়া নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়ারও কোনো যুক্তি নেই। রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে হলে আশঙ্কাকে তথ্য থেকে এবং ভবিষ্যদ্বাণীকে প্রমাণ থেকে আলাদা করতে হয়।

ভারতের অভিজ্ঞতা অবশ্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের সাংবিধানিক পথ। এখানে সরকার বদলেছে, দল বদলেছে, জোট বদলেছে এবং ভোটার বহুবার ক্ষমতাসীনদের প্রত্যাখ্যান করেছে। এই রাজনৈতিক অভ্যাসই গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাবলয়।

ভারতের ইতিহাসে অবশ্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিপ্লবী কল্পনাও ছিল। নকশাল আন্দোলন তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ। সেই আন্দোলনকে ঘিরে সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি অংশে যে রোমান্টিকতা তৈরি হয়েছিল, তা আজ ইতিহাসের আলোকে পুনর্বিবেচনার বিষয়। বন্দুকের নল দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ধারণা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী গণতন্ত্রের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

ভারতের বর্তমান রাজনীতিতেও ডানঘেঁষা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থানকে বুঝতে হলে একই প্রশ্ন করতে হয় মানুষ কেন এমন রাজনীতির দিকে যাচ্ছে? উত্তর খুঁজতে হবে জাতীয় পরিচয়, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, অভিবাসন, ধর্ম, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা সবকিছুর মধ্যে।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেইঃ জনগণ ভুলও করতে পারে, আবার মতও বদলাতে পারে। কিন্তু সেই মত পরিবর্তনের পথ যদি ব্যালট বাক্সের মধ্যেই থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের কাঠামো টিকে থাকে। আর যখন নির্বাচন কেবল ক্ষমতাসীনদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্রের ভিতরে জমতে থাকে রাজনৈতিক চাপ।

রাশিয়া, চীন, বাংলাদেশ, ভারত কিংবা ইউরোপ প্রত্যেকের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। কিন্তু একটি সত্য সর্বজনীন: নির্বাচন তখনই অর্থবহ, যখন জনগণের হাতে সত্যিকার অর্থে বেছে নেওয়ার এবং প্রয়োজনে ক্ষমতাসীনকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই কে জিতলো সেটা নয়; কে হেরে যেতে পারে কিন্তু সমপাক্ষিক মতামতের জায়গা নিশ্চিত হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত করা।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version