ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো ৯ জনের মধ্যে পাঁচ বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় একই পরিবারের তিন সদস্যসহ দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে নিহতদের স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গভীর রাতে কলকাতার ব্যস্ত নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে ভয়াবহ আগুন লাগে। রাত ২টা ৭ মিনিটের দিকে হোটেলের তৃতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি পুরো হোটেল ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা অতিথিরা আতঙ্কিত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন। তবে ঘন ধোঁয়ার কারণে অনেকেই কক্ষ থেকে বের হতে পারেননি।

নিহত বাংলাদেশিরা হলেন- শর্ণশিষ দত্ত, আফসানা শিম্মিন, দেবাশিস দত্ত, আকরাম আলী ও আহামেদ বাবু। এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে ভারতের ঝাড়খণ্ডের ১৯ বছর বয়সী সন্দীপ পাসওয়ান রয়েছেন। আরও তিনজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

নিহতদের মধ্যে শর্ণশিষ দত্তের বয়স মাত্র আড়াই বছর। তার সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন বাবা সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত (৩৯), মা আফসানা শিম্মিন (২৭) এবং নানা আকরাম আলী। অর্থাৎ একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের চারজন সদস্যই এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন।

দেবাশিস দত্তের বাড়ি কুষ্টিয়া মডেল থানার মোহিনী মিল এলাকার আরুয়াপাড়ায়। তার বাবার নাম দিলীপ কুমার দত্ত। নিহত আকরাম আলীর বাড়ি কুষ্টিয়া হেড পোস্ট অফিস এলাকার বদরুদ্দোজা রোডে।

অন্যদিকে, নিহত আহামেদ বাবুর বয়স সাড়ে তিন বছর। তার বাড়ি ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বেগুনবাড়ি এলাকায়। তার বাবার নাম আদম আলী।

নিহতদের মধ্যে রয়েছে দুই নিষ্পাপ শিশু। আড়াই বছরের শর্ণশিষ ও সাড়ে তিন বছরের আহামেদ বাবুর জীবনের শুরুতেই এমন করুণ পরিণতি স্বজনদের শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর দমকলকর্মীরা হোটেলের ভেতর থেকে অচেতন অবস্থায় নয়জনকে উদ্ধার করে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসও ৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। ফলে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা নিয়ে প্রাথমিক বিভিন্ন তথ্যের পর এখনো সরকারি পর্যায়ে বিস্তারিত যাচাই চলছে।

আগুন লাগার পর হোটেলের বিভিন্ন কক্ষ ধোঁয়ায় ভরে যায়। ঘুম ভেঙে আতঙ্কিত হয়ে অনেকে দরজা খুলে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ধোঁয়ার তীব্রতায় দিশেহারা হয়ে পড়েন তারা। কেউ কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইঞ্জিন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। উদ্ধার অভিযানে ভবনটি থেকে প্রায় ৬০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

অগ্নিকাণ্ডে আহত কয়েকজনকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহত অন্তত ছয়জনের চিকিৎসা চলছে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে।

প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হোটেলটিতে ন্যূনতম অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাও যথাযথ ছিল না। তৃতীয় তলায় থাকা একটি এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ঘটনায় কলকাতা পুলিশ মামলা করেছে। হোটেলের মালিক ও কয়েকজন কর্মী ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাদের সন্ধানে অভিযান চলছে।

অগ্নিকাণ্ডের সময় হোটেলটিতে প্রায় ২৫ জন বাংলাদেশি অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া এসব বাংলাদেশির মধ্যে কয়েকজনের এমন করুণ মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version