বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড ও নরওয়ের লড়াইকে ঘিরে যতটা আলোচনা দুই দলের, তার চেয়েও বেশি নজর থাকছে দুই মহাতারকা স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন ও আর্লিং হালান্ডের মুখোমুখি দ্বৈরথে। গোলের ক্ষুধা, দুর্দান্ত ফর্ম এবং দলের ভরসার প্রতীক- সব মিলিয়ে আজকের ম্যাচে কে হাসবেন শেষ হাসি, সেটিই এখন ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় কৌতূহল।

ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া হলেও জাতীয় দলে নরওয়ের প্রতিনিধিত্ব করা হালান্ডের কাছে ম্যাচটি বাড়তি আবেগের। ক্লাব ফুটবলে ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিতে ইংল্যান্ডের মাঠেই নিজের সাম্রাজ্য গড়েছেন তিনি। এবার সেই পরিচিত পরিবেশেই বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভাঙতে মাঠে নামবেন নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৭ গোল করে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন হালান্ড। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনের গোল ৬টি। বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকারও ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় পার করছেন। ফলে বিশ্বের সেরা দুই গোলমেশিনের এই লড়াই বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

ইংল্যান্ডের উইঙ্গার মর্গান রজার্স অবশ্য বিশ্বাস করেন, শেষ পর্যন্ত কেইনই এগিয়ে থাকবেন। তবে প্রতিপক্ষের তারকাকে নিয়ে তাঁর কণ্ঠে ছিল নিখাদ শ্রদ্ধা।

রজার্স বলেন, “আর্লিং হালান্ডকে কখনও পুরোপুরি থামানো গেছে কি না, আমি নিশ্চিত নই। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। সে অসাধারণ একজন ফুটবলার। মাঠে যা করে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।”

হালান্ডের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে কেন তাঁকে নিয়ে এত আলোচনা। নরওয়ের হয়ে টানা ১৪ আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করেছেন তিনি, এই সময়ে করেছেন অবিশ্বাস্য ২৭ গোল। ব্রাজিলের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে জোড়া গোল করে দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার নায়কও ছিলেন তিনি।

ইংল্যান্ডের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ, দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সেন্টারব্যাক মার্ক গেহি চোটের কারণে খেলতে পারবেন না। রিস জেমসের খেলাও অনিশ্চিত। ফলে হালান্ডকে আটকানো ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের জন্য কঠিন পরীক্ষাই হতে যাচ্ছে।

এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় ৮টি করে গোল নিয়ে শীর্ষে আছেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে। তাদের ঠিক পেছনেই অবস্থান করছেন হালান্ড ও কেইন। ফলে এই ম্যাচ গোল্ডেন বুটের লড়াইকেও আরও উত্তপ্ত করে তুলবে।

শুধু হালান্ড নন, গোটা নরওয়েই এবার ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এই দেশটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ‘ভাইকিং’ জাতির উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত। সাহস, লড়াইয়ের মানসিকতা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অদম্য মনোবলের প্রতীক ছিল ভাইকিং যোদ্ধারা। সেই ঐতিহ্যের প্রতিফলন যেন দেখা যাচ্ছে বর্তমান নরওয়ে দলেও।

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠাই নরওয়ের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্য। তাই তাদের হারানোর কিছু নেই, বরং প্রতিটি ম্যাচই নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ। ছোট দেশ হলেও দলটি নিজেদের সাহসী ও আক্রমণাত্মক ফুটবল দিয়ে ইতোমধ্যেই বিশ্বকে চমকে দিয়েছে।

হালান্ডও প্রত্যাশার চাপ নিয়ে খুব একটা ভাবছেন না। তাঁর মতে, শিরোপার দাবিদার ইংল্যান্ডই, তাই চাপটাও থাকবে তাদের ওপর।

হালান্ড বলেন, “সত্যি বলতে এখনও আমাদের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। কয়েকটি দেশ পরিষ্কারভাবে ফেভারিট, ইংল্যান্ড তাদের অন্যতম। তাই চাপটা তাদের ওপরই থাকা উচিত। আমরা শুধু নিজেদের সেরাটা খেলতে চাই।”

হালান্ড ও কেইনের সাফল্যের পথ একেবারেই আলাদা। ছোটবেলা থেকেই বিস্ময়বালক হিসেবে পরিচিত ছিলেন হালান্ড। ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার পর খুব দ্রুতই বিশ্বসেরাদের কাতারে জায়গা করে নেন।

অন্যদিকে হ্যারি কেইনের পথ ছিল দীর্ঘ ও কঠিন। টটেনহ্যামে বছরের পর বছর গোল করেও শিরোপাহীন থাকার হতাশা নিয়ে শেষ পর্যন্ত বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন। এরপরই বদলে যায় তাঁর ক্যারিয়ার। জার্মান ক্লাবটির হয়ে টানা দুই মৌসুম বুন্দেসলিগা জয়ের পাশাপাশি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুটও জিতেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক।

আজ মায়ামিতে তাই শুধু ইংল্যান্ড-নরওয়ে ম্যাচ নয়, এটি হবে দুই সময়ের সেরা স্ট্রাইকারের গোলযুদ্ধ। একদিকে ইংল্যান্ডের দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্বপ্ন, অন্যদিকে ভাইকিংদের ইতিহাস গড়ার অভিযাত্রা- সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে এক রোমাঞ্চকর মহারণ।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version