ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামল নিয়ে একের পর এক গুরুতর দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের উপদেষ্টা, কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। এসব অভিযোগের কয়েকটির বিষয়ে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই ও অনুসন্ধানও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো আদালত বা তদন্তের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখার সুযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কথিত ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সে সময় দেশের মানুষের একটি বড় অংশ সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, বৈষম্য হ্রাস এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সেই প্রত্যাশা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিভিন্ন অভিযোগে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি এবং অর্থপাচারের অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি নিয়োগ ও বদলি, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক সুবিধা প্রদান, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের মতো বিষয়।

অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো মেয়াদে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ দুদকে জমা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিপুল অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করে পর্তুগাল, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে বিনিয়োগ বা সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।

অভিযোগের একটি অংশে দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অর্থের উৎস, মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসূত্রের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্ত প্রয়োজন।

সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ জমা পড়ার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগগুলোতে বিচারক, আইন কর্মকর্তা ও সাব-রেজিস্ট্রারদের নিয়োগ-বদলিতে অনিয়ম, জামিন ও বদলি বাণিজ্য এবং প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায় করা হয়েছে।

অভিযোগে বিদেশে সম্পদ গড়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় সম্পদ এবং সুইস ব্যাংকে হিসাব থাকার কথা বলা হয়েছে।

পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধেও হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে।

অভিযোগে তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর মাধ্যমে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর সম্পদ বিক্রির অর্থের সঙ্গেও এসব লেনদেনের যোগসূত্র রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের বিরুদ্ধেও বিদেশে সম্পদ কেনার অভিযোগ থাকার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তার নিকটাত্মীয়ের নামে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে একটি বিলাসবহুল বাড়ি কেনা হয়েছে।

এদিকে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির তথ্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

দুর্নীতির এসব অভিযোগের ব্যাপারে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- দুদক কতটা নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও তথ্যপ্রমাণভিত্তিক তদন্ত করতে পারে।

অভিযোগ জমা পড়া আর দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত অবস্থান বিবেচনা না করে প্রত্যেকটি অভিযোগের আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, সম্পদের উৎস, বিদেশি বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা জরুরি।

একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বক্তব্য নেওয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়াও তদন্তের স্বচ্ছতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যদি সত্যিই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ বা বিদেশে পাচারের ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।

কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়- জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা। এখন দেশের মানুষের অপেক্ষা, দুর্নীতির অভিযোগের রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং প্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও তার প্রকাশ্য ফলাফলের দিকে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version