টমেটো-ডিমের দামে সর্বোচ্চ উল্লম্ফন, বেড়েছে মাছ-মুরগি ও অধিকাংশ সবজির দাম

রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে গত ছয় মাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। মার্চের তুলনায় সেপ্টেম্বরের শুরুতে বেড়েছে ডিম, টমেটো, কাঁচা মরিচ, মাছ, মুরগি ও বেশ কয়েকটি সবজির দাম। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে টমেটোর দাম। একই সময়ে কিছু পণ্যের দাম সামান্য কমলেও সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফিরছে না বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে মার্চের শুরুর দামের সঙ্গে বর্তমান বাজারদর তুলনা করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

টমেটোর দাম বেড়েছে কয়েক গুণ

বাজারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে টমেটোর দামে। ছয় মাস আগে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া টমেটো এখন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি। অর্থাৎ সময়ের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ৮০ থেকে ১১০ টাকা।

লম্বা বেগুন এখন ৭০ টাকা এবং গোল বেগুন ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মার্চে বেগুনের দাম ছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা।

হাইব্রিড শসা বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং দেশি শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। মার্চে হাইব্রিড শসা ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। আগাম শিমের দামও বেড়ে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় উঠেছে। পটোল, ঢ্যাঁড়স ও কাঁকরোল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি।

দ্বিগুণের কাছাকাছি কাঁচা মরিচ

কাঁচা মরিচের দামও গত ছয় মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যেখানে মার্চের শেষ দিকে দাম ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা।

তবে সব পণ্যের দাম বাড়েনি। করলার দাম কিছুটা কমে বর্তমানে ৮০ টাকা কেজি হয়েছে, যা মার্চে ছিল প্রায় ১০০ টাকা। পেঁপের দামও প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে- প্রতি কেজি ৪০ টাকা।

ডিমের দামে বড় চাপ

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে ডিমের দামও ক্রেতাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে। বর্তমানে এক ডজন ডিম ১৫০ টাকা এবং চারটি ডিম ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মার্চে প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল ১১০ থেকে ১২০ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে ডজনপ্রতি ডিমের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ টাকা।

ডিম বিক্রেতা মাসুম বলেন, ফার্মের মুরগির ডিম চারটি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে দাম নিয়মিত বাড়ছে, কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বেড়েছে মুরগির দামও

মুরগির বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা কেজি দরে। মার্চে ব্রয়লারের দাম ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ছিল প্রায় ৩০০ টাকা।

তবে গরুর মাংসের দামে তেমন পরিবর্তন হয়নি। বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮০০ টাকা, মার্চেও প্রায় একই দামে বিক্রি হয়েছে।

মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি

গত ছয় মাসে মাছের দামও বেড়েছে। তেলাপিয়া বর্তমানে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি, যেখানে মার্চে ছিল ২০০ থেকে ২৩০ টাকা। পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, যা মার্চে ছিল ১৮০ থেকে ২২০ টাকা।

আকার ও মানভেদে রুই-কাতলার দাম ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, টেংরা প্রায় ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাহিদাসম্পন্ন কিছু দেশি মাছের দাম কেজিতে ১ হাজার টাকাও ছাড়িয়েছে।

রায়সাহেব বাজারের মাছ বিক্রেতা মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, মাঝারি আকারের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নদীর বেলে ও চাহিদাসম্পন্ন দেশি মাছের দাম ১ হাজার টাকার বেশি। মাছের আকার, মান, জীবিত না মৃত এবং বাজারে সরবরাহের ওপর দাম নির্ভর করে। একই মাছের দাম বাজারভেদে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমবেশি হতে পারে।

‘৫০০ টাকায় যা মিলত, এখন তা মিলছে না’

দাম বৃদ্ধির চাপে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। নারিন্দা বাজারের ক্রেতা আবাবিল কবির বলেন, ছয় মাসে বাজারের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। কিছু পণ্যের দাম কমলেও ডিম, মাছ ও অধিকাংশ সবজির দাম এখনও নাগালের বাইরে।

তিনি বলেন, ছয় মাস আগে ৫০০ টাকা দিয়ে যে কয়েকটি প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যেত, এখন একই টাকায় তা কেনা সম্ভব হচ্ছে না। চাল, ডালসহ অন্যান্য খরচও বেড়েছে। ফলে সংসারের ব্যয় সামলাতে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে।

আরেক ক্রেতা আবু দাউদ বলেন, বেশির ভাগ সবজির দাম বেড়েছে। অনেক পণ্যে কেজিতে অন্তত ১০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ৮০ টাকার নিচে সবজি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। টমেটো, বেগুনসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম ১০০ টাকার কাছাকাছি বা তার বেশি।

তার ভাষায়, দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করে সংসার চালাতে গিয়ে মাছ, সবজি ও চালের মধ্যে কোনটি কিনবেন, সেটিই ঠিক করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি

ছয় মাসের ব্যবধানে নিত্যপণ্যের বাজারে দাম বৃদ্ধির এই প্রবণতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য মাছ, ডিম ও সবজির মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য নিয়মিত কেনা কঠিন হয়ে উঠছে।

ক্রেতাদের দাবি, শুধু বাজারদর পর্যবেক্ষণ নয়- সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ এবং কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version