মাঝআকাশে হঠাৎ প্রায় ৩০০ ফুট উচ্চতা হারানো এয়ার ইন্ডিয়ার ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটের প্রধান পাইলটের শরীরে গাঁজার উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর তাকে বরখাস্ত করেছে এয়ার ইন্ডিয়া। সাইকোঅ্যাকটিভ মাদক পরীক্ষায় পজিটিভ ফল আসার পর শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) তার বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, পাইলটের নমুনার চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণ পরীক্ষায় গাঁজা শনাক্ত হয়। বিষয়টিকে গুরুতর হিসেবে উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল ভারতের এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি)।

এর আগে এএআইবির প্রাথমিক প্রতিবেদনে বিষয়টি নিয়ে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল এভিয়েশনকে (ডিজিসিএ) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে ফ্লাইটে হঠাৎ উচ্চতা কমে যাওয়ার পেছনে পাইলটের মাদক গ্রহণের ভূমিকা ছিল কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। কারিগরি বিষয়গুলো নিয়েও বিস্তারিত তদন্ত চলছে। এএআইবির চূড়ান্ত তদন্ত শেষ হতে এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-২৩৭৯ ফ্লাইটটি ১৩৭ যাত্রী ও আটজন ক্রু নিয়ে ফুকেট থেকে দিল্লির উদ্দেশে উড়ছিল। ভারতের ওড়িশা উপকূলের কাছাকাছি আকাশে উড্ডয়নের সময় বিমানটি হঠাৎ ‘ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্সে’ পড়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্ধারিত ৩৬ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা বিমানটি প্রথমে প্রায় ৩৭২ ফুট ওপরে ওঠে এবং এরপর ২৯২ ফুট নিচে নেমে যায়। একই সময়ে বিমানের তিনটি হাইড্রলিক ব্যবস্থাই সাময়িকভাবে বিকল হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় অটোপাইলটও। প্রায় দুই সেকেন্ডের জন্য চালু হয় স্টল সতর্কবার্তা।

এ ধরনের সতর্কতা সাধারণত পর্যাপ্ত লিফট তৈরি না হলে বিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সময় দেখা দেয়।

তবে ওই সময় বিমানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কো-পাইলট দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেন। পরবর্তী সময়ে হাইড্রলিক ব্যবস্থাগুলো স্বাভাবিক হলে ফ্লাইট পরিচালনাও স্বাভাবিক হয়ে আসে।

তীব্র ঝাঁকুনিতে যাত্রী ও ক্রুদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আহত হন। ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী কে রামমোহন নাইডুর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় চার থেকে পাঁচ মিনিট ধরে ঝাঁকুনি চলেছিল। কয়েকজন কেবিন ক্রু ঘাড় ও মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পান।

দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। মোট ১৭ জন-১৩ যাত্রী ও চার কেবিন ক্রু- হাসপাতালে ভর্তি হন। এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পরদিনই সব যাত্রীকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ঘটনার সময় বিমানের কেবিনের বিভিন্ন অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছাদের প্যানেলে ফাটল ও খুলে যাওয়ার পাশাপাশি হাতল বাঁকা বা ভেঙে যায়। জরুরি বহির্গমন পথ, ওপরের লাগেজ রাখার বক্স এবং একটি টয়লেটের কমোডও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পেছনের দরজার কাছে থাকা একটি ক্রু সিটসহ আরও কিছু সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঘটনার পর ওই ফ্লাইটের এক যাত্রী ডিজিসিএর ‘এয়ারসেবা’ পোর্টালে লিখিত অভিযোগ করেন। তার দাবি, তীব্র ঝাঁকুনির সময় কয়েকজন যাত্রী আসন থেকে ছিটকে বিমানের ছাদে আঘাত পান। এতে তার ৬২ বছর বয়সী শাশুড়ির পাঁজর ও মেরুদণ্ডে আঘাত লাগে এবং ৬৪ বছর বয়সী শ্বশুরও আহত হন।

ওই যাত্রী প্রশ্ন তোলেন, গুরুতর আহত যাত্রী থাকা সত্ত্বেও কেন দিল্লির পরিবর্তে কাছাকাছি কোনো বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করা হয়নি। দিল্লিতে অবতরণের পর পর্যাপ্ত হুইলচেয়ার, অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া নিয়েও তিনি অভিযোগ করেন।

এ ছাড়া ঘটনার সময় বিমানের ভেতরে ভিডিও বা ছবি ধারণ না করতে ক্যাপ্টেন যাত্রীদের সতর্ক করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, তারা বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করছে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version