জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী পালনের বিতর্কের পর এবার পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে কাওয়ালি; অর্থায়ন নিয়েও রহস্য
যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এবার ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে কাওয়ালি সন্ধ্যার আয়োজন ঘিরে তীব্র প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকদের ঐতিহাসিক এই প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের সন্ধ্যায় এমন আয়োজন কেন- এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাবাব চত্বরে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কাওয়ালি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্লাবের বাগানে প্যান্ডেল নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। অনুষ্ঠানে শিল্পী সামীর এবং সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন আরমান ও তাঁদের দল কাওয়ালি পরিবেশন করবেন বলে আমন্ত্রণপত্রে জানানো হয়েছে।
কিন্তু ‘কাওয়ালি সন্ধ্যা’ নামের আড়ালে ১৪ আগস্টের এই আয়োজনের দিন-তারিখই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ, ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। আর পরদিনই বাংলাদেশে ১৫ আগস্ট- জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়গুলোর একটি। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় পাকিস্তানের জাতীয় দিবসের দিনে বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে পাকিস্তানি সংস্কৃতির কাওয়ালি আয়োজন করা হচ্ছে- এ বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন ক্লাবের সদস্যরা।
তাদের প্রশ্ন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক যেখানে এতটাই রক্তাক্ত, সেখানে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা কী?
এর আগে ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অনুষ্ঠানটি একটি সংগঠনের ব্যানারে হলেও সেখানে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মো. আইয়ুব ভূঁইয়াসহ কয়েকজন সাংবাদিকের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
দুই বছর না পেরোতেই এবার একই প্রেক্ষাপটে সামনে এসেছে নতুন আয়োজন। পার্থক্য হলো- এবার কোনো বাইরের সংগঠনের ব্যানারে নয়, জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণেই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের দিনে কাওয়ালি সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে।
ফলে সদস্যদের প্রশ্ন, জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী থেকে কি এবার পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের দিকে এগোচ্ছে জাতীয় প্রেস ক্লাব? আয়োজনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে অর্থায়ন নিয়ে। ক্লাবের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পাকিস্তান দূতাবাসের অর্থায়নে এই কাওয়ালি সন্ধ্যার আয়োজন করা হচ্ছে। অর্থের পরিমাণ ২০ লাখ টাকা বলেও দাবি করা হয়েছে। তাই প্রশ্ন আরও জোরালো- যদি সত্যিই পাকিস্তান দূতাবাসের অর্থে বাংলাদেশের জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থ গ্রহণের সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন? কোন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছে? এবং ক্লাবের সাধারণ সদস্যদের তা জানানো হয়নি কেন?
জাতীয় প্রেস ক্লাবের একাধিক সদস্যের দাবি, ১৪ আগস্টের আয়োজন সম্পর্কে সাধারণ সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি। ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় বিষয়টি কীভাবে অনুমোদিত হয়েছে, সেটিও পরিষ্কার নয়।
সদস্যদের একটি অংশের বক্তব্য, জাতীয় প্রেস ক্লাব কোনো সাধারণ বিনোদনকেন্দ্র নয়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেখানে বিদেশি এবং আমাদের মহান স্বাধীনতার বিরোধী রাষ্ট্রের জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজন হলে অন্তত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও অর্থায়ন জনসমক্ষে পরিষ্কার করা উচিত।
এবারের আয়োজন নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আইয়ুব ভূঁইয়ার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী পালনের বিতর্কিত আয়োজনেও তাঁর উপস্থিতি আলোচনায় এসেছিল।
এবার তাঁর নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সময়েই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের দিন প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে কাওয়ালি আয়োজন হওয়ায় সদস্যদের একাংশ দুই ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজছেন।
তাদের প্রশ্ন, এটি কি শুধুই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, নাকি পাকিস্তানের সঙ্গে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নেওয়ার কোনো বৃহত্তর উদ্যোগ?
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সঙ্গে পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইয়ুব ভূঁইয়ার নেতৃত্বে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ১০ সদস্যের একটি সাংবাদিক প্রতিনিধি দল পাকিস্তান সফর করে। সফরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান (এপি), পাকিস্তান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন, পাকিস্তান টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিনিধি দলের মতবিনিময় হয়।


