জনসংখ্যা কমছে, জন্মহারও রেকর্ড নিম্নমুখী- এর মধ্যেই জাপানে বাড়ছে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। বর্তমানে জাপানে এমন মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জনে। একই সঙ্গে এই সংখ্যা টানা ৫৬ বছর ধরে বেড়ে চলেছে, যা দেশটির দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে।

জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৭ হাজার ৯১৪ জন। অর্থাৎ একদিকে দেশের মোট জনসংখ্যা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘায়ু মানুষের সংখ্যা নতুন রেকর্ড তৈরি করছে।

পরিসংখ্যানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো- জাপানের শতবর্ষী জনগোষ্ঠীর বড় অংশই নারী। মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জনের মধ্যে ৯৪ হাজার ২৯৮ জন নারী, যা মোট শতবর্ষীর প্রায় ৮৮ শতাংশ। পুরুষের সংখ্যা ১৩ হাজার ৩৭৯ জন। অর্থাৎ জাপানে প্রতি ১০০ জন শতবর্ষীর মধ্যে প্রায় ৮৮ জনই নারী। গত কয়েক বছর ধরেই শতবর্ষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীদের আধিপত্য বজায় রয়েছে।

জাপানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনিচিরো উয়েনো বলেন, এত বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘ সময় সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপন করছেন- এটি আনন্দের বিষয়। মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায়, জীবনযাত্রার পরিবেশের উন্নতি, খাদ্য ও পুষ্টির মানোন্নয়ন এবং চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রগতি দীর্ঘায়ুর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জাপানে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা নতুন নয়। ১৯৬৩ সালে দেশটিতে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫৩ জন। ১৯৮১ সালে তা ১ হাজার ছাড়ায়। ১৯৯৮ সালে অতিক্রম করে ১০ হাজারের সীমা। ২০১২ সালে এই সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়ানোর পর এবার প্রথমবারের মতো তা ১ লাখের গণ্ডি পেরিয়েছে।

এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৮ হাজার মানুষের এই বৃদ্ধি জাপানের দীর্ঘায়ু প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তবে শতবর্ষীর সংখ্যা বৃদ্ধি জাপানের জন্য শুধু দীর্ঘায়ুর সাফল্যের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় ধরনের জনমিতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও।

দেশটিতে জন্মহার দীর্ঘদিন ধরে কমছে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আকারও সংকুচিত হচ্ছে। ফলে বয়স্ক মানুষের চিকিৎসা, পেনশন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যয় সামলাতে রাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ছে। একই সময়ে শ্রমবাজারে কর্মীর ঘাটতি তৈরি হওয়ায় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও এর প্রভাব পড়ছে।

জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকরভাবে দীর্ঘায়ু হওয়া সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে টেকসই রাখা জরুরি।

কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে জাপান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি কর্মীদের জন্য বিভিন্ন কর্মসংস্থানের পথ সম্প্রসারণ করেছে। বিশেষ করে শ্রমিক সংকটে থাকা খাতগুলোতে বিদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ জাপানের সামনে এখন একসঙ্গে দুটি বাস্তবতা- একদিকে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমছে। এই দুই প্রবণতার ভারসাম্য রক্ষা করাই দেশটির ভবিষ্যৎ জননীতি ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

জাপানের সর্বশেষ পরিসংখ্যান তাই শুধু দীর্ঘায়ুর নতুন রেকর্ড নয়; একই সঙ্গে এটি দেশটির বদলে যাওয়া জনসংখ্যার কাঠামো এবং ক্রমবর্ধমান বয়স্ক সমাজের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version