রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা গড়ে ওঠে তখনই, যখন আইনের প্রয়োগ হয় সমানভাবে, নিরপেক্ষভাবে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে। কিন্তু সাম্প্রতিক বাংলাদেশে জামিনকে ঘিরে যে বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে, তা বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

কয়েক সপ্তাহ আগে দেশের মানুষ দেখেছে নব্বইয়ের দশকের কুখ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী নাঈম আহমেদ টিটনকে। হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই ব্যক্তি জামিনে মুক্ত হওয়ার পর জনসম্মুখে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। শুধু টিটনই নন, গত দুই বছরে আরও অনেক আলোচিত সন্ত্রাসী, চিহ্নিত অপরাধী এবং উগ্রবাদী সংগঠনের নেতাকর্মী জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে, যেগুলোকে সরকার ‘গায়েবি’ ও ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক’ মামলা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

কিন্তু একই রাষ্ট্রে, একই বিচারব্যবস্থার অধীনে কয়েকজন সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সমাজকর্মী প্রায় দুই বছর ধরে কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে হত্যার অভিযোগ, কিন্তু সেই অভিযোগের ভিত্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই রয়েছে বিস্তর বিতর্ক। প্রশ্ন হচ্ছে-যখন শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জামিন পান, তখন সাংবাদিক শাকিল আহমেদ, ফারজানা রূপা, শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু কিংবা প্রবীণ বুদ্ধিজীবী শাহরিয়ার কবির কেন জামিন পান না? এ প্রশ্ন কেবল কয়েকজন ব্যক্তির নয়; এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার প্রশ্ন।

শাহরিয়ার কবির বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক সুপরিচিত নাম। সেই মানুষটির বিরুদ্ধেই মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপা, যাদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে, তারাও দীর্ঘদিন ধরে মুক্তির অপেক্ষায়। অথচ বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারা, এমনকি আলোচিত মামলার আসামিরাও আদালত থেকে জামিন পাচ্ছেন এখানেই জন্ম নেয় বৈষম্যের প্রশ্ন।

কোনো ব্যক্তি সাংবাদিক, শিক্ষক বা বুদ্ধিজীবী হলেই তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন। আবার রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কেউ বিচারহীনতার শিকারও হতে পারেন না। যদি কোনো সাংবাদিক পেশাগত নৈতিকতা লঙ্ঘন করে থাকেন, যদি কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন কিংবা অবৈধ সম্পদের মালিক হয়ে থাকেন-তবে তদন্ত হোক, মামলা হোক, বিচার হোক। কিন্তু প্রমাণহীন বা প্রশ্নবিদ্ধ অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে জামিন পাওয়ার পরও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে অভিযুক্তদের মুক্তির পথ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতা সাধারণ মানুষের মনে এমন ধারণা তৈরি করছে যে, বিচারিক প্রক্রিয়াকে কখনো কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমন ধারণা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার সংস্কৃতি নতুন নয়। বিভিন্ন সরকারের আমলেই বিরোধী মতকে দমনের জন্য মামলা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় যেমন অনেক ‘গায়েবি’ ও বিতর্কিত মামলা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, তেমনি বর্তমান সময়েও যদি একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য কোনো ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। অন্যায়ের প্রতিকার কখনো নতুন অন্যায়ের মাধ্যমে হতে পারে না।

এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষণ সংস্থা Committee to Protect Journalists (সিপিজে) একাধিকবার বিবৃতি দিয়ে আটক সাংবাদিকদের মুক্তি, সুচিকিৎসা ও ন্যায়বিচারের আহ্বান জানিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিন্তু দেশের ভেতরে এ নিয়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় জনমত গড়ে ওঠেনি। আরও দুঃখজনক হলো, সাংবাদিক সমাজের বড় একটি অংশও এ বিষয়ে দৃশ্যমানভাবে সোচ্চার নয়।

জামিন কোনো দয়া নয়, এটি আইনি অধিকার। আদালত যদি মনে করেন কোনো আসামি পলাতক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবেন না, সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট করবেন না কিংবা জননিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি নন, তাহলে তাকে জামিন দেওয়া বিচারব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। জামিন মানে খালাস নয়; জামিন মানে বিচার চলাকালীন স্বাধীনভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ।

আজ দেশের মানুষ জানতে চায়-কিসের ভিত্তিতে একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী জামিন পান, অথচ একজন প্রবীণ বুদ্ধিজীবী বা সাংবাদিক বছরের পর বছর কারাগারে থাকেন? কিসের ভিত্তিতে একজন রাজনৈতিক নেতা মুক্তি পান, অথচ আরেকজন অভিযুক্তের জামিন বারবার আটকে যায়? এই প্রশ্নগুলোর জবাব শুধু আদালতের জন্য নয়, রাষ্ট্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ন্যায়বিচার কেবল হতে হবে না, সেটি দৃশ্যমানও হতে হবে। বিচারব্যবস্থা যদি জনগণের কাছে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে প্রতিভাত না হয়, তবে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা; প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা; এবং একই সঙ্গে নির্দোষ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার মানুষদের অযথা কারাভোগ থেকে মুক্ত করা।

বাংলাদেশ আর কোনো বিভক্ত বিচারব্যবস্থা চায় না। মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের শাসনই হবে শেষ কথা; যেখানে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই হবে রাষ্ট্রের মূল শক্তি। কারণ সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার আদালতের স্বাধীনতা, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তার মাধ্যমে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version