ভারত-চীনের স্বার্থের প্রতিযোগিতায় নতুন ভূরাজনৈতিক মাত্রা, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও কারিগরি সহায়তার আগ্রহ

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা তিস্তা নদীর পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। গত দুই মাসে রংপুর ও তিস্তা অঞ্চল সফর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি পৃথক প্রতিনিধি দল। সর্বশেষ গত ১০ সেপ্টেম্বর তিন দিনের সফর শেষে রংপুর ছাড়ে পাঁচ সদস্যের একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প পরিদর্শন করেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর পানি সম্পদ প্রকৌশলী ক্যালভিন ট্রেভর ফেসোজ ক্রিচ।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, মার্কিন প্রতিনিধি দলগুলো তিস্তা অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কারিগরি তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ দেখিয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সহায়তার ধরন, তথ্য সংগ্রহের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু কিংবা তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।

গত ৯ সেপ্টেম্বর তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প পরিদর্শন করেন মার্কিন সেনাবাহিনীর পানি সম্পদ প্রকৌশলী ক্যালভিন ট্রেভর ফেসোজ ক্রিচ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের চার কর্মকর্তা- চার্লস ফিলিপ বেসনার জুনিয়র, ডেভিড ইভান হার্লি, উইলিয়াম স্টিভেনসন লোগান চতুর্থ এবং মিশেল অ্যাঞ্জেলা হিলারি।

এর এক দিন পর, ১০ সেপ্টেম্বর তিন দিনের সফর শেষে রংপুর ত্যাগ করে পাঁচ সদস্যের আরেকটি মার্কিন প্রতিনিধি দল। এর আগে গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শন করেন।

বাপাউবোর প্রকৌশলীদের সঙ্গে নিয়ে ব্যারাজ এলাকা ঘুরে দেখার পর রাষ্ট্রদূত তিস্তাকে ‘উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তিস্তা অঞ্চল বা বৃহত্তর তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো বাংলাদেশ ও চীনের সরকারি পর্যায়ের সমঝোতার আওতায় প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন চূড়ান্ত চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে তিস্তার আন্তঃসীমান্ত পানিপ্রবাহ ও নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা অগ্রাধিকারের কারণে নদীটিকে ঘিরে ভারতেরও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। ফলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে আঞ্চলিক পানি কূটনীতি ও ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও জড়িত। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সফর প্রকল্পটিকে নতুন একটি কৌশলগত মাত্রা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ার পর প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাপাউবোর ওই কর্মকর্তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনা আলোচ্যসূচিতে ছিল না। পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার প্রকল্পটি বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথা ঘোষণা করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘোষণার পরপরই তিস্তা এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রতিনিধি দলের সফর হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তার দাবি, মার্কিন প্রতিনিধি দলগুলো তিস্তা অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছে। এ সময় তারা প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কারিগরি তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহের পাশাপাশি তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পে সম্ভাব্য কারিগরি সহায়তার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এদিকে বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, চীনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা পর্যায়ে নজরদারি করে আসছে। বিভিন্ন পরিচয়ে মার্কিন কূটনীতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রকল্প পরিদর্শন করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।

সূত্রটির আরও দাবি, বাংলাদেশ সরকারের অবগতির মধ্যেই গত দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছে।

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন, কৃষি, সেচ ও পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নদীটির পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেকোনো বৃহৎ উদ্যোগের প্রভাব পড়তে পারে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে।

এই বাস্তবতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি মনোযোগ প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলছে। তবে ওয়াশিংটনের ভূমিকা কেবল পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি পরামর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে তা বৃহত্তর কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সম্পৃক্ততায় রূপ নেবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত।

মার্কিন প্রতিনিধি দলগুলোর সফর, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য কারিগরি সহায়তার আগ্রহ- সব মিলিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ঘিরে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত মিলছে। এখন নজর থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রস্তাব, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন ও ভারতের অবস্থানের ওপর।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version