তীব্র দাবদাহের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি ও চাহিদার ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশে আবারও প্রকট আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ সংকট। রাজধানীর বাইরে অধিকাংশ জেলায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শিল্পকারখানা, কৃষি খামার, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট, জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রোববার সারা দেশে গড়ে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করতে হয়েছে। এর আগে গত মে মাসেও প্রায় একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছিল দেশ। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ গরমের তীব্রতা ক্রমাগত বাড়ছে এবং বিদ্যুতের চাহিদাও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে।
বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় সীমিত আকারে বিচ্ছিন্ন লোডশেডিং হলেও তা এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি অনেক বেশি সংকটপূর্ণ। বহু জেলায় দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে। বিশেষ করে শিল্প ও কৃষিনির্ভর এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় দৈনিক ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের অভিযোগ আসতে থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তা করছে সরকার।
জানা গেছে, বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোডশেডিং কমাতে ইউনাইটেড পাওয়ার কোম্পানির দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বৃদ্ধির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার সংসদ সচিবালয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে এবং অন্য ইউনিটটিও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে খুলনার ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, অর্থ সংকট, গ্যাসের ঘাটতি এবং কয়লাভিত্তিক বড় দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন না পাওয়ায় পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ঘাটতিও সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ খাতে এত বড় চাপের পরিস্থিতি খুব কমই দেখা গেছে।
ময়মনসিংহের ভালুকার বড়াই এলাকার বাসিন্দা রবিন বড়ুয়া বলেন, দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। রাতেও কখন বিদ্যুৎ আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। টেক্সটাইল কারখানা ও কৃষি খামারগুলোও উৎপাদন সংকটে পড়েছে।
রাজধানীসংলগ্ন কেরানীগঞ্জের সাবান ফ্যাক্টরি এলাকার বাসিন্দা সোহেল আহমেদ বলেন, তাদের এলাকায় প্রতিদিন আট থেকে দশ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। রাজধানীর খুব কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও এমন বৈষম্যমূলক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
চট্টগ্রামের লোহাগড়া এলাকার বাসিন্দা ইমন আহমেদ জানান, তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কখন বিদ্যুৎ আসবে সেই অপেক্ষায় থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধান এবং বিতরণ ব্যবস্থায় কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সামনের দিনগুলোতে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।শিরোনামটি আরও আকর্ষণীয় করতে চাইলে আমি কয়েকটি বিকল্পও দিতে পারি।


