কলকাতার নিউমার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি নিয়ে উঠেছে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন। ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তর থেকে মাত্র ঢিল ছোড়া দূরত্বে থাকা পাঁচতলা হোটেলটিতে জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার জন্য আলাদা কোনো বহির্গমন সিঁড়ি ছিল না। সরু সিঁড়ি, ঘিঞ্জি পরিবেশ ও অপর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তার মধ্যেই চলছিল হোটেল ব্যবসা।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাত ২টার দিকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৮ জনই বাংলাদেশি বলে জানা গেছে।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, হোটেলের তৃতীয় তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ভবনের ভেতরের অংশ। ঘন কালো ধোঁয়ার কারণে হোটেলের কক্ষগুলোতে থাকা অনেকেই বের হওয়ার পথ খুঁজে পাননি। ফলে আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই অনেকের মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আগুন ও ধোঁয়া দেখতে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা উদ্ধারকাজে সহায়তার পাশাপাশি দমকল বাহিনীকে খবর দেন। খবর পেয়ে কলকাতা ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।

দমকলকর্মীরা হোটেলের বিভিন্ন কক্ষ থেকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করেন। তাদের দ্রুত কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা সবাইকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় আরও ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ঘটনার পর হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রাথমিক তদন্তে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। হোটেলে পর্যাপ্ত পানি, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং জরুরি সময়ে দ্রুত বের হওয়ার জন্য পৃথক বহির্গমনপথ ছিল না বলে জানা গেছে।

পাঁচতলা ভবনটির ভেতরে ছিল সরু সিঁড়ি। আগুন লাগার পর ধোঁয়ায় সেই সিঁড়ি ব্যবহার করে নিরাপদে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষের জন্য পরিস্থিতি দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, কলকাতা ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তর ও নিউমার্কেট থানার এত কাছে থাকা একটি হোটেলে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও সেটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। একই সঙ্গে হোটেলটির অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র ও নিয়মিত পরিদর্শন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নিউমার্কেটের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বহু ভবনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। সরু গলি, ঘনবসতি ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে আগুন লাগলে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়ে। এই ঘটনায় প্রশাসনের নজরদারি ও অনুমোদন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে বিস্ফোরণ অথবা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। পাশাপাশি পুলিশও তদন্ত শুরু করেছে। এরই মধ্যে হোটেলটি সিল করে দেওয়া হয়েছে।

নিউমার্কেটের মতো ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং বিপুল প্রাণহানির ঘটনায় কলকাতাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে দমকল সদর দপ্তরের এত কাছে থাকা একটি হোটেলে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ সামনে আসায় ক্ষোভ আরও বাড়ছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version