লুট হওয়া বিপুল অস্ত্র ও কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া শত শত বন্দি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশের লুট হওয়া এক হাজার ৩১১টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। একই সঙ্গে বিভিন্ন কারাগার থেকে পালানো ২ হাজার ২৪৭ বন্দির মধ্যে ৬৯০ জন এখনও পলাতক। নিখোঁজ এসব অস্ত্র ও বন্দিকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ ইতোমধ্যে অপরাধীদের হাতে পৌঁছে গেছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পুলিশের ধারণা, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের কিছু দেশের সীমানা পেরিয়েও চলে যেতে পারে।

পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১০৯টি চায়নিজ রাইফেল ও ৩০টি সাবমেশিনগান (এসএমজি)। এসব অস্ত্রের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদও এখনও উদ্ধার হয়নি। হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৫৭ হাজার ১২৫টি গুলি।

অন্যদিকে, কথিত জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যায় ২ হাজার ২৪৭ বন্দি। তাদের মধ্যে ৬৯০ জন এখনও অধরা। এ ছাড়া ১৬৬ জনের বিষয়ে কোনো নথি পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পলাতক বন্দিদের কেউ কেউ নতুন করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

লুট হওয়া অস্ত্র ও পলাতক আসামিদের তৎপরতার মধ্যে দেশে সহিংস অপরাধ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৪৭টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সাত মাসে হত্যা মামলা বেড়েছে ১২৯টি।

এ সময় সারা দেশে ১২৩টি গুলির ঘটনায় ৫৯ জন নিহত হয়েছেন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খুনের ঘটনা তুলনামূলক বেশি। এসব ঘটনায় ভাড়াটে খুনি, চরমপন্থি ও সুন্দরবনকেন্দ্রিক জলদস্যুদের সম্পৃক্ততার তথ্যও সামনে এসেছে।

পুলিশ সদরদপ্তর বলছে, অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে অস্ত্রের একটি অংশ দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

পুলিশ সদরদপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অবৈধ অস্ত্রের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সীমান্তের বাইরে অস্ত্র চলে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদ্য সাবেক এক সদস্যের ভাষ্য, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার ও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র ও পলাতক বন্দিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

অপরাধ বিশ্লেষক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পেশাগত সমন্বয়ের ঘাটতি এখনও রয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত এ সমস্যা রয়েছে। শুধু সিদ্ধান্ত নিলে হবে না, সেটির কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। নিজেদের মধ্যে পেশাগত ঐক্যের ঘাটতিও দূর করা জরুরি।

সাবেক র‍্যাবপ্রধান এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাওয়াটা অবশ্যই বড় ধরনের হুমকি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সম্প্রতি সারা দেশে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অস্ত্রের সন্ধান দিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলে ১০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

শুধু অভিযান ও পুরস্কার ঘোষণা যথেষ্ট নয়। লুট হওয়া প্রতিটি অস্ত্রের গতিপথ শনাক্ত, সীমান্তপথে পাচার ঠেকানো এবং কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা না গেলে এসব অস্ত্র ও অপরাধীদের ঘিরে নিরাপত্তাঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version