দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নতুন নেতৃত্ব নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে কমিশনের চেয়ারম্যান এবং ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সোমবার, ১৭ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ৬-এর উপধারা (১) অনুযায়ী তিনজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই আইনের ধারা ৫-এর উপধারা (১) অনুযায়ী বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে দুদক চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। জনস্বার্থে জারি করা এ প্রজ্ঞাপন অবিলম্বে কার্যকর হবে।

নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। গেজেট অনুযায়ী, চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর বেতন, ভাতা, অন্যান্য সুবিধা ও পদমর্যাদা আপিল বিভাগের একজন বিচারকের সমপর্যায়ের হবে। অন্যদিকে ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার বেতন, ভাতা, অন্যান্য সুবিধা ও পদমর্যাদা হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারকের সমপর্যায়ের নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে নতুন কমিশন গঠনের পরপরই এর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও দলীয়করণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপি সরকার নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্তর্ভুক্ত করে দুদককেও নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবের বলয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। একটি স্বাধীন ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির পেশাগত যোগ্যতা, সততা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতাসীন দল থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, আমলা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের। ফলে কমিশনের সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার বিষয়ে জনগণের আস্থা না থাকলে দুদকের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। দলীয়করণের অভিযোগ থাকলে অন্য সরকারের আমলে একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন করে না। বরং এতে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।

এর আগে গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন। এরপর কয়েক মাস কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ে শূন্যতা তৈরি হয়। নতুন কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটি গঠন করা হয় এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই শেষে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়।

নতুন কমিশনারদের মধ্যে ড. জাহাঙ্গীর আলম খান সাবেক সচিব এবং ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কর কমিশনার। তাঁদের প্রশাসনিক ও আর্থিক খাতে অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকেই নিয়োগের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখানো হতে পারে।

তবে রাজনৈতিক বিতর্কের মূল প্রশ্নটি অন্য জায়গায়- দুদকের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা বাস্তবে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন? দুর্নীতি দমন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশেই নির্ভর করে রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ঊর্ধ্বে উঠে আইন অনুযায়ী কাজ করার ওপর। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী, বিরোধী দলের রাজনীতিক কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, অভিযোগের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে পারাই হবে নতুন কমিশনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ দুদক যদি রাজনৈতিক সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তাহলে দুর্নীতি দমনের পরিবর্তে দুর্নীতির অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়। অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে এমন অভিযোগ উঠেছে বলেই নতুন কমিশনের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি সামনে এসেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version