জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, কয়লার দাম ঊর্ধ্বমুখী- লোকসান ছাড়াতে পারে ৬০ হাজার কোটি টাকা

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির বড় চাপ এসে পড়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে। কয়লা, ফার্নেস অয়েল, তেল ও এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি দ্রুত ফুলে উঠছে সরকারের ভর্তুকি ও লোকসানের বোঝা। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে পিডিবির লোকসান ৪৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও তা ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়া এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা উত্তোলন কমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রতি বছর ইন্দোনেশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি করে। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশটি গত বছর কয়লা উত্তোলন প্রায় ২৫ শতাংশ কমিয়েছে। এর সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজভাড়া ও পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কয়লার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রতি টন কয়লার দাম যেখানে আগে প্রায় ১১০ ডলার ছিল, তা বেড়ে ১৪০ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। ফলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুধু বিদ্যুৎ নয়, জ্বালানি খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। বাড়তি দামে তেল কিনে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় গত আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

অন্যদিকে, বেশি দামে এলএনজি আমদানির কারণে গত ছয় মাসে পেট্রোবাংলার লোকসান হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ তেল ও গ্যাস খাত মিলিয়েই লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ খাতে লোকসান কমানোর লক্ষ্যে গত জুনে বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেই উদ্যোগের সুফল এখন ম্লান হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এরই মধ্যে গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তি পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে পিডিবির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের চিত্র উঠে আসে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে পিডিবির লোকসান ছিল প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনছে গড়ে ১২ টাকা ৩৫ পয়সায়, অথচ বিক্রি করছে ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়।

জাতীয় কমিটি আরও জানিয়েছিল, বিশেষ বিধানের আওতায় করা বিভিন্ন বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে ভর্তুকির বোঝা আরও বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর চাপ বহুগুণে বাড়তে পারে। জ্বালানি ব্যয় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি- সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাত এখন বড় আর্থিক ঝুঁকির মুখে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version