রাজধানীর ধানমন্ডিতে অস্ত্রের মুখে ৩৮ লাখ টাকা ডাকাতির ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারদের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তিনজন অবসরপ্রাপ্ত সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন অতীতে র‍্যাবেও কর্মরত ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- তানভীর আবেদীন (৪১), মো. মজিবুর রহমান (৬০), মো. জাকির হোসেন ওরফে ক্যাপ্টেন জাকির (৬০), মো. সোলায়মান মৃধা (৫৫), মোহাম্মদ কবির হোসেন (৫০), আবুল কালাম আজাদ (৫০), মো. জাকারিয়া হোসেন ওরফে লেলিন (৪০), সজল চৌধুরী (৩১) ও সায়মুন চৌধুরী (৩৩)।

গত ৩০ আগস্ট দুপুর আনুমানিক ২টা ১০ মিনিটে ধানমন্ডি মডেল থানার ১২ নম্বর সড়কে ডিঙ্গি রেস্টুরেন্টের সামনে খোরশেদ আলম নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে ৩৮ লাখ টাকা লুট করে ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল।

ডাকাতির পর পালিয়ে যাওয়ার সময় ধানমন্ডি মডেল থানা পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তানভীর আহমেদ জুয়েল ও মো. মুজিবুর রহমানকে আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে চার রাউন্ড গুলিসহ একটি দেশীয় রিভলভার উদ্ধার করা হয়।

পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণখান এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. জাকির হোসেন ওরফে ‘ক্যাপ্টেন জাকির’কে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পটুয়াখালী, কুয়াকাটা বাসস্ট্যান্ড, মোহাম্মদপুর ও বায়তুল মোকাররমসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রটির আরও ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার মো. জাকারিয়া হোসেন ওরফে লেলিনের কাছ থেকে লুট হওয়া ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৫০ টাকা এবং সজল চৌধুরীর কাছ থেকে ২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫০ টাকা উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে। বাকি টাকা কোথায় রয়েছে এবং ডাকাতির সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তা জানতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

ভুক্তভোগী খোরশেদ আলম স্বর্ণ কেনার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে চক্রটির সদস্যদের সঙ্গে ধানমন্ডির একটি স্থানে দেখা করতে যান। স্বর্ণের লেনদেনের কথা বলে তাকে রিকশাযোগে ডিঙ্গি রেস্টুরেন্টের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই এলাকায় আগে থেকেই লেলিনের নেতৃত্বে চার-পাঁচজন অবস্থান করছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী সংকেত পাওয়ার পর চক্রের অন্য সদস্যরা রিকশাটির গতিরোধ করেন। এরপর অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে মারধর করা হয়। পরে কয়েকজন মোটরসাইকেলে করে টাকা নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

পুলিশ বলছে, চক্রটির কয়েকজন সদস্য স্বর্ণ কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত। তারা স্বর্ণ কেনার আগ্রহী ক্রেতা খুঁজে বের করতেন। এরপর তাদের জানানো হতো- তাদের কাছে স্বর্ণ রয়েছে এবং কিনতে হলে নগদ টাকা নিয়ে আসতে হবে। ক্রেতা টাকা নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে এলে স্বর্ণ দেওয়ার কথা বলে অন্যত্র নেওয়া হতো। সুযোগ বুঝে সেখানে পরিকল্পিতভাবে ডাকাতি করা হতো।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই একাধিক মামলা রয়েছে। তানভীর আহমেদ জুয়েলের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় চারটি মামলা রয়েছে। সজল চৌধুরীর বিরুদ্ধে ডাকাতি ও ছিনতাই-সংক্রান্ত ছয়টি মামলা পাওয়া গেছে। জাকারিয়া হোসেনের বিরুদ্ধে মাদক এবং হত্যা বা হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দুটি মামলা রয়েছে। আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধেও তিনটি মামলা রয়েছে।

গ্রেপ্তার নয়জনের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তারা হলেন- মো. মুজিবুর রহমান, যিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট পদ থেকে অবসর নিয়েছেন; মোহাম্মদ জাকির হোসেন ওরফে ক্যাপ্টেন জাকির, যিনি অনারারি ক্যাপ্টেন পদ থেকে অবসর নিয়েছেন; এবং মো. সোলায়মান মৃধা, যিনি সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। পুলিশের দাবি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ অতীতে র‍্যাবেও কর্মরত ছিলেন।

এ ঘটনায় ধানমন্ডি মডেল থানায় একটি ডাকাতি ও একটি অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তের মাধ্যমে ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী, সহযোগী ও লুট হওয়া বাকি টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

পুলিশ জানিয়েছে, চক্রটির আরও কয়েকজন সদস্য পলাতক রয়েছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version