রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভায় ভবন নির্মাণে নিয়ম-কানুন যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ। গত প্রায় দেড় বছরে একটি ভবনেরও নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়নি, অথচ একই সময়ে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে শত শত আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ হয়েছে প্রকাশ্যেই। অনুমোদন ছাড়াই এসব নির্মাণ চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পৌর কর্তৃপক্ষ। ফলে সরকার হারিয়েছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব, আর পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ঝুঁকিতে পড়েছে পুরো পৌর এলাকা।
প্রশাসনিক শিথিলতা, দায়িত্বে অবহেলা এবং দুর্নীতির সুযোগে ভবন নির্মাণে এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ভবন মালিকের দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেও অনৈতিকভাবে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে “মৌখিক অনুমোদন” দেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার প্রকৌশল বিভাগে টাকা নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও পৌরসভার কোষাগারে সেই অর্থ জমা হয়নি কিংবা কোনো বৈধ রশিদও দেওয়া হয়নি।
চারঘাট পৌরসভা প্রশাসনিক ও কৌশলগতভাবে রাজশাহীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভা। বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদা এবং রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এই পৌরসভার আওতায়। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভা দীর্ঘদিনে একটি পরিকল্পিত আধুনিক নগরীতে পরিণত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। নিয়ম ভেঙে একের পর এক বহুতল ভবন, মার্কেট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মিত হলেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
গত দেড় বছরে ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য একটি আবেদনও জমা পড়েনি। ফলে অনুমোদন ফি বাবদ পৌরসভার কোষাগারে একটি টাকাও আসেনি। অথচ এর আগের পাঁচ বছরে ৫৭টি ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পৌরসভার ২৮ বছরের ইতিহাসে কয়েক হাজার ভবন অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, দুই থেকে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ চলছে নিয়মের তোয়াক্কা না করেই। কোথাও রাস্তার গা ঘেঁষে, কোথাও ড্রেনের ওপর, আবার কোথাও ভবনের পাশে জরুরি যানবাহন চলাচলের ন্যূনতম জায়গাও রাখা হয়নি। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ভবিষ্যতে রাস্তা সম্প্রসারণ, ড্রেনেজ, অগ্নিনির্বাপণ কিংবা অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হবে।
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী পৌর এলাকায় ভবন নির্মাণ, সম্প্রসারণ বা পরিবর্তনের আগে নকশা অনুমোদন বাধ্যতামূলক। আইন অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ হলে নির্মাণকাজ বন্ধ, জরিমানা কিংবা অবৈধ অংশ অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষের। কিন্তু চারঘাট পৌরসভায় দীর্ঘদিন ধরে সেই আইনের কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায়নি।
প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় ভবনের নকশা অনুমোদনের আবেদন ফি এক হাজার টাকা। ভবনের ধরন ও আয়তন অনুযায়ী অতিরিক্ত ফিও নির্ধারিত রয়েছে। একটি চার বা পাঁচতলা বাণিজ্যিক ভবন থেকেই ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত রাজস্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেই হিসাবে শত শত ভবন অনুমোদন ছাড়া নির্মিত হওয়ায় সরকার সম্ভাব্য কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, পৌরসভার ভেতরের একটি অসাধু চক্র নিয়মিত অনৈতিকভাবে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ভবন মালিকদের মৌখিক অনুমোদন বা ভুয়া কাগজপত্র সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন ভবন মালিক জানিয়েছেন, তারা প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের হাতে হাজার হাজার টাকা দিলেও পৌরসভার কোনো বৈধ অনুমোদনপত্র বা রশিদ পাননি।
এক ভবন মালিক জানান, তিনি প্রায় ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার পর নকশায় স্বাক্ষর পেলেও পৌরসভার কোষাগারে অর্থ জমার কোনো প্রমাণ বা অনুমোদনের কাগজ পাননি। অন্য আরেকজনের ভাষ্য, কয়েকবার আবেদন করতে গেলেও গুরুত্ব না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ শুরু করেন।
তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় প্রশাসনিক দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং দুর্নীতির সুযোগে চারঘাট পৌরসভায় ভবন নির্মাণে অনিয়ম ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দায়িত্বশীল পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় এবং জবাবদিহিতার অভাবে একটি প্রভাবশালী অসাধু চক্র এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও নেওয়া প্রয়োজন।
চারঘাটের সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী রতন কুমার বলেন, দীর্ঘদিন নকশা অনুমোদনের কার্যক্রম অচল থাকলে পরিকল্পিত নগরায়ণ সম্ভব নয়। এতে ভবিষ্যতে রাস্তা সম্প্রসারণ, পানি নিষ্কাশন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগসহ নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চারঘাট উপজেলা সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, শূন্য পদে দ্রুত কর্মকর্তা নিয়োগ, অনুমোদনহীন ভবন চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হারানো রাজস্ব আদায়ে জরুরি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে চারঘাট পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মজিবর রহমান বলেন, ভবন নির্মাণের আগে নকশার অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। অনুমোদনের জন্য পৌরসভায় পৃথক কমিটি রয়েছে। তবে গত এক থেকে দেড় বছরে কাউকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অনুমোদনহীন ভবনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


