বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংকট আরও গভীর হয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, ঋণ জালিয়াতি ও দুর্বল তদারকির ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাত কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। উচ্চ সুদের প্রলোভন দেখিয়েও নতুন আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে পুরোনো আমানত ফেরত দিতে না পারায় আমানতকারীদের মধ্যে চরম অনাস্থা তৈরি হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার দুরবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
দেশের ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। সুদ যোগ হওয়ার পরও আমানতের প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থবির। একই সময়ে ঋণের পরিমাণ কমে ৭৮ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায় নেমেছে, যা নতুন বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এরই মধ্যে পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান- পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, আভিভা ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট- বন্ধের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে; ব্যর্থ হলে সেগুলোও একীভূত বা পুনর্গঠনের আওতায় আনা হবে।
বন্ধ হতে যাওয়া পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মোট আমানত ১৩ হাজার ৩০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। সরকার সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ফেরতের পরিকল্পনা করেছে, যা বর্তমান ২ লাখ টাকার আমানত বীমা সীমার তুলনায় বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই সুবিধা কারা পাবেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক খাতে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, অনিয়ম ও ঋণ লুটের কারণে বহু প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। নতুন ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় আদায় হওয়া অর্থের বড় অংশই এখন পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যবহার হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে দেশের আর্থিক খাতের সংকট আরও প্রকট হয়েছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক দুর্বলতা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতির কারণে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাত এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। তাঁদের মতে, দ্রুত কার্যকর সংস্কার ও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে আর্থিক খাতের সংকট আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে।


