টেন্ডার ছাড়াই প্রস্তাব, মডেল পিএসসি-২০২৩ অনুযায়ী গ্যাসের দামে উঠছে বড় প্রশ্ন

দেশের গ্যাস অনুসন্ধানের অন্যতম সম্ভাবনাময় স্থলভাগের দুই ব্লক ১১ ও ১২- নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মার্কিন বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি শেভরনের প্রস্তাব। প্রায় ৬ হাজার ২২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত এই দুই ব্লকের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের জন্য সংরক্ষিত বা ‘রিং-ফেন্সড’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। এখন সেখানে শেভরনকে অনুসন্ধানের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে সরকারি পর্যায়ে পর্যালোচনা চলছে।

শেভরন ব্লক-১১ ও ১২-তে নতুন করে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়নের আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রস্তাবটি প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে নয়; বরং বিশেষ বিবেচনায় চুক্তির সম্ভাবনা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। এ কারণে প্রস্তাবটির আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ- সবকিছু নতুন করে যাচাই করতে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে পর্যালোচনা কমিটি গঠনের তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্লক-১১ বিস্তৃত সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও ময়মনসিংহের অংশজুড়ে। অন্যদিকে ব্লক-১২ সুরমা বেসিনের গ্যাসসমৃদ্ধ এলাকায় অবস্থিত। শেভরন বর্তমানে বাংলাদেশের ব্লক-১২, ১৩ ও ১৪-এর আওতায় বিবিয়ানা, জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন পরিচালনা করছে।

বিশেষ করে ব্লক-১১ নিয়ে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ব্লককে অতীতে বাপেক্সের উন্নয়নের জন্য সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে রাখা হয়েছিল। বাপেক্স ও বিদেশি অংশীদার MOECO-ও সেখানে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করেছিল। বাপেক্সের পক্ষ থেকে ব্লক-১১-এ সুনেত্রা-২, সুনেত্রা ইস্ট-১, মদন-১ ও মদন-২সহ অনুসন্ধান ও উন্নয়নকূপ খননের পরিকল্পনার কথাও সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এই অঞ্চলের গ্যাস সম্ভাবনা নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা রয়েছে। পুরোনো ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়নে সুনেত্রা কাঠামোয় প্রায় ২.৪৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF) গ্যাসের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এটি প্রমাণিত উত্তোলনযোগ্য মজুত নয়; এটি সম্ভাব্য সম্পদের পুরোনো হিসাব- ফলে নতুন অনুসন্ধান ও কূপ খননের মাধ্যমে তা যাচাই করা প্রয়োজন।

অর্থাৎ, প্রশ্নটি শুধু একটি বিদেশি কোম্পানিকে অনুসন্ধানের সুযোগ দেওয়ার নয়; প্রশ্ন হচ্ছে দেশের সম্ভাবনাময় গ্যাসসম্পদ উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের ভূমিকা কী থাকবে এবং চুক্তির অর্থনৈতিক কাঠামো কী হবে।

শেভরনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ। বাংলাদেশে বিদ্যমান পুরোনো অনশোর চুক্তির আওতায় শেভরন বর্তমানে প্রায় ২.৭৬ ডলার/MMBtu দরে গ্যাস সরবরাহ করছে।

অন্যদিকে Model PSC 2023-এ গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিন মাসের গড় Brent crude-এর দামের ১০ শতাংশ ব্যবহারের বিধান রয়েছে। Brent-এর দাম বেশি হলে এই সূত্রে গ্যাসের দাম বর্তমান অনশোর দামের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৩-এর মূল্য কাঠামো সরাসরি অনশোর ব্লকে প্রয়োগ করা যাবে কি না, সেটিই আলোচনার একটি বড় আইনি ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন। আগের পর্যালোচনায়ও এ বিষয়ে জটিলতার কথা উঠে এসেছে।

বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে কারণ শেভরনের আগ্রহ শুধু নতুন অনুসন্ধান এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতীতে প্রতিষ্ঠানটি রশিদপুর ও ছাতক গ্যাসক্ষেত্রসহ ব্লক-১১ নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্রটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের মালিকানাধীন।

রশিদপুরে শেভরনের আগ্রহের বিষয়ে ২০২২ সালেও পেট্রোবাংলার সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। সে সময় পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে শেভরনকে প্রস্তাব দেওয়ার কথা বলা হলেও বিষয়টি চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নেয়নি।

এখানেই সবচেয়ে বড় নীতিগত প্রশ্নটি সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শেভরন ব্লক-১১ ও ১২-তে প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ‘বিশেষ বিবেচনায়’ কাজ করার অনুমতি চেয়েছে।

পরবর্তীতে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি তিন সদস্যের কমিটি শেভরনের প্রস্তাব এবং আগের পর্যালোচনা রিপোর্ট পরীক্ষা করার জন্য গঠিত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটি কোনো টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ২০২৬ সালের আগস্টেও শেভরনের অনশোর অনুসন্ধান প্রস্তাব নতুন করে যাচাইয়ের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশ যখন দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকট মোকাবিলা করছে, তখন দেশের নিজস্ব গ্যাসসম্পদের নতুন অনুসন্ধান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে- রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাপেক্সের জন্য সংরক্ষিত এলাকায় বিদেশি কোম্পানিকে কী শর্তে প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে, গ্যাসের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, সরকারের অংশ কত থাকবে এবং চুক্তিটি প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় হবে কি না।

কারণ দেশের গ্যাসসম্পদ একবার চুক্তির আওতায় গেলে তার প্রভাব বহু বছর ধরে জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে পড়তে পারে।

তাই ব্লক-১১ ও ১২ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তের আগে চুক্তির পূর্ণ শর্ত, গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের সূত্র, রাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব, বাপেক্সের ভূমিকা, অনুসন্ধানের ব্যয় ও ঝুঁকি এবং টেন্ডার না করার আইনগত ভিত্তি- সবকিছু জনসমক্ষে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version