জননেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি হল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি রাজনৈতিক নেতা তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশজুড়ে। দীর্ঘ ছয় দশকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত জটিলতা, নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও প্যারালাইসিসসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এবং পরবর্তী আট মাসেরও বেশি সময় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বিভিন্ন দলের নেতা, কর্মী, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর স্কয়ার হাসপাতালে ভিড় করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। পরে ধানমণ্ডির ত্বাকওয়া মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দেওয়া ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে আলোচনার জন্ম দেয়।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, জীবদ্দশায় তোফায়েল আহমেদের ইচ্ছা ছিল জন্মভূমি ভোলার মাটিতেই সমাহিত হওয়ার। সেই ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর মরদেহ আজ ভোলায় নেওয়া হবে। ভোলা সরকারি জিলা স্কুল মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে সদর উপজেলার কোড়ালিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হবে। একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী বলেন, “বাবা সারাজীবন মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। বিশেষ করে ভোলার মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অসীম ভালোবাসা। তাঁর শেষ ইচ্ছাই আমরা পূরণ করছি।”

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঐতিহাসিক ঘোষণাটি করেছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর অন্যতম আঞ্চলিক অধিনায়ক। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব, রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী, মন্ত্রী এবং একাধিকবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৯টিতে বিজয়ী হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরল রেকর্ড।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, “তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সাহসী, দূরদর্শী এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ একজন রাজনৈতিক সংগঠক। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন সংগ্রামী নায়ককে হারাল।” সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী বলেন, “তোফায়েল আহমেদের মতো নেতা সহজে জন্ম নেন না। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনীতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।” তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর খবরে ভোলাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাঁর গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের ঢল নামে। স্থানীয়দের মতে, ভোলার উন্নয়ন, জাতীয় রাজনীতিতে জেলার অবস্থান শক্তিশালী করা এবং ভোলাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করে তোলার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভোলা জেলা বিএনপির নেতারাও তাঁকে একজন অভিভাবকসুলভ নেতা হিসেবে স্মরণ করেছেন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যুতে একটি রাজনৈতিক প্রজন্মের অবসান ঘটলেও ইতিহাসের পাতায় তিনি থেকে যাবেন একজন সংগ্রামী ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং জনগণের নেতা হিসেবে।

বিদায়, বীর নেতা তোফায়েল আহমেদ।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version