দেশের একদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের ক্রমবর্ধমান আর্থিক দায় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরও কাঙ্ক্ষিত সেবা না মেলার অভিযোগের মধ্যে এবার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ ঘাটতি ও বকেয়া ভর্তুকির বোঝা সামনে এসেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের নথি অনুযায়ী, শুধু মাতারবাড়ী ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়াই প্রায় ৪ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। পাশাপাশি পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের ট্যারিফ ঘাটতি ও বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায়ও সরকারের ওপর চাপ তৈরি করছে।

বকেয়া অর্থ দ্রুত ছাড় না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা ও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে- এমন আশঙ্কা জানিয়ে অর্থ সচিবকে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে- হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরও কেন জনগণকে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে?

পিডিবিকে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান পূরণে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

পিডিবির হিসাবে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহে গড় ব্যয় প্রায় ১২ টাকা ৯৭ পয়সা, বিপরীতে বিক্রয়মূল্য প্রায় ৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটেই বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ব্যবস্থার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ভর্তুকি, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং কেন্দ্রগুলোর অন্যান্য দায়ও বহন করতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে।

বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে ক্যাপাসিটি চার্জ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রায় ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা দেওয়ার প্রক্ষেপণ রয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার জন্য অর্থ পরিশোধের দায় থেকে যাচ্ছে সরকারের।

এখানেই প্রশ্ন উঠছে- যে বিপুল অর্থ জনগণের করের টাকা থেকে বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় হচ্ছে, তার বিনিময়ে মানুষ কাঙ্ক্ষিত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে কি না।

পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের অর্থায়নে চীনের এক্সিম ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন ঋণ সিন্ডিকেট থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। এর ৫০ শতাংশের জন্য বাংলাদেশ সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি দিয়েছে। ইতোমধ্যে ঋণের প্রথম কিস্তির আসল ও সুদ পরিশোধ করা হয়েছে। সামনে রয়েছে আরও ১৩৬.১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধের দায়।

অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর খরচের পাশাপাশি বিদেশি ঋণের দায়ও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

বিদ্যুৎ সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশেষ আইন বাতিল হলেও ওই আইনের অধীনে আগে করা চুক্তিগুলো কার্যকর থাকবে এবং চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

সরকার বলছে, উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার অতিরিক্ত ব্যয় কোনোভাবেই সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো হবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভর্তুকির এই বিপুল অর্থ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকেই আসে। আর রাষ্ট্রীয় বাজেটের অর্থ মানেই জনগণের অর্থ।

শুধু একের পর এক বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ করে বিদ্যুৎ খাতের সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিদ্যুৎ ক্রয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি ব্যয় এবং গ্রাহক পর্যায়ের ট্যারিফ- সবকিছুর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। নইলে আজ মাতারবাড়ীর ৪ হাজার ৬৫১ কোটি টাকার বকেয়া পরিশোধ করা হলেও আগামীকাল নতুন কোনো কেন্দ্রের ট্যারিফ ঘাটতি সামনে আসবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version