রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকার আবাসিক হোটেল ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডে দীর্ঘ প্রায় আট মাস অবস্থান করে বিপুল পরিমাণ ভাড়া বকেয়া রেখে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে হোটেলের কক্ষ ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং নারী-পুরুষের অবাধ যাতায়াতের অভিযোগও তুলেছে।
হোটেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এনসিপির পাঁচ নেতার কাছে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ টাকা ভাড়া বকেয়া রয়েছে। এ বিষয়ে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে অভিযুক্ত পাঁচ নেতা হলেন- ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার, সাদেক মির্জা, মিরাসাত হোসেন হিমেল, শাখাওয়াত হোসেন ও তাওসীপ। তাদের মধ্যে শাহরিয়ার এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সদস্য সচিব এবং অন্যরাও একই ইউনিটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
হোটেলের মহাব্যবস্থাপক খন্দকার রুহুল আমিনের স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ কার্যালয় সংস্কারের কাজের কথা জানিয়ে এনসিপির কয়েকজন সমন্বয়ক হোটেলটিতে ওঠেন। পরে ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা হোটেলের ৭২৫ ও ৭২৭ নম্বর কক্ষ ব্যবহার করেন।
হোটেল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, প্রতিটি কক্ষের দৈনিক ভাড়া ছিল ৩ হাজার টাকা। সেই হিসেবে আট মাসে দুটি কক্ষের মোট ভাড়া দাঁড়ায় ১১ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ টাকা। বুকিংয়ের সময় মাত্র ১০ হাজার টাকা অগ্রিম পরিশোধ করা হলেও পরবর্তীতে আর কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নেতারা দলীয় পরিচয়ের কারণে সরল বিশ্বাসে হোটেলে থাকার সুযোগ পান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ জমা হতে থাকে। হোটেল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ওই কক্ষগুলোতে দিন-রাত ব্যাপক আনাগোনা ছিল এবং প্রায়ই নারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির যাতায়াত দেখা যেত। এমনকি এ-সংক্রান্ত সিসিটিভি ফুটেজও সংরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
হোটেলের হিসাব বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ কাজল বলেন, “তারা যখন রুম বুকিং নেয়, তখন ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দেয়। কিন্তু এরপর আর কোনো ভাড়া পরিশোধ করেনি। আমরা একাধিকবার পাওনা অর্থের বিষয়ে কথা বলেছি। প্রতিবারই তারা টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো সময় জানায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “রাতে প্রায়ই সেখানে আড্ডা চলত। তাদের সঙ্গে আরও লোকজন আসত। অনেক সময় নারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির যাতায়াত দেখা গেছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানালে তারা আমাদের কাজে হস্তক্ষেপ না করার কথা বলে।”
মোহাম্মদ কাজল জানান, বকেয়া ভাড়া আদায়ের জন্য বহুবার চেষ্টা করেও সফল না হওয়ায় তারা এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। নির্বাচনের পরদিন তারা হোটেলে গিয়ে দেখেন, অভিযুক্তরা আর সেখানে নেই। পরে কক্ষগুলোর তালা ভেঙে পরিষ্কার করে পুনরায় ভাড়া দেওয়া হয়।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পাওনা অর্থ চাওয়ায় হোটেল কর্তৃপক্ষকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। বকেয়া অর্থ পরিশোধ না হলে এবং বিষয়টির সুরাহা না হলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে জনসমক্ষে সব তথ্য তুলে ধরা হবে বলেও সতর্ক করেছে হোটেল কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক সাদেক মির্জা বলেন, “হোটেলের দুটি কক্ষে আমাদের কয়েকজন অবস্থান করতেন। তবে ভাড়া পরিশোধ বা বুকিং সংক্রান্ত বিষয়ে আমি অবগত নই। আন্দোলনের সময় কয়েকবার সেখানে গিয়েছি এবং রাত হয়ে গেলে অনেকে সেখানে থেকেছে।”
অন্যদিকে শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “রুমটি আমার নামে বুক করা হয়নি। কে ভাড়া নিয়েছে, সে বিষয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবে। আমি সেখানে গিয়েছি, এটা সত্য। তবে ভাড়ার বিষয়টি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।”
এনসিপির যাত্রাবাড়ী থানার প্রধান সমন্বয়কারী মিরাসাত হোসেন হিমেলও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি ওই হোটেলে গিয়েছি বলে মনে পড়ে না। অভিযোগকারী কে, সেটিও জানতে চাই।”
এদিকে বিষয়টি নিয়ে দলীয় অবস্থান জানতে চাইলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। সংগঠনের শৃঙ্খলা কমিটি বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ বকেয়া ভাড়া এবং দলীয় তদন্তের ঘোষণাকে ঘিরে বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তদন্তের ফলাফল এবং সম্ভাব্য আইনগত পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।


