থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ-বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও ৬০ জনের বেশি আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। রোববার গভীর রাতে শহরের চাতুচাক জেলার ‘রং বিয়ার না লাত ফ্রাও’ বারে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ও ঘন ধোঁয়ায় পুরো ভবন ছেয়ে গেলে প্রাণ বাঁচাতে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। অনেকেই বের হওয়ার পথ না পেয়ে ভবনের ভেতরেই আটকা পড়েন।
মঞ্চের কাছাকাছি অংশ থেকে প্রথমে আগুনের সূত্রপাত হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে আতঙ্কিত হয়ে দর্শনার্থীরা যে যেদিকে পারেন বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কেউ আগুনের ভেতর দিয়েই বের হওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার কারও পোশাকে আগুন ধরে গেছে। চিৎকার-আর্তনাদে পুরো এলাকা বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে।
খবর পেয়ে মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন দমকলকর্মীরা। আগুন নেভানোর পর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে বারের একটি শৌচাগার থেকে অধিকাংশ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ধোঁয়া ও আগুনের হাত থেকে বাঁচতে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু ঘন ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়।
প্রাথমিক তদন্তে ব্যাংককের দুর্যোগ প্রশমন বিভাগ জানিয়েছে, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এয়ার কন্ডিশনার) বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ফরেনসিক তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চানভিরাকুল বলেন, আগুন লাগার সময় মঞ্চে একজন শিল্পী গান পরিবেশন করছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো একটি শব্দ শোনার পরই ধোঁয়া ও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই প্রধান নির্গমনপথে পৌঁছাতে না পেরে ভবনের পেছনের দিকে গিয়ে শৌচাগারে আশ্রয় নেন, যেখানে পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে নয়জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী রয়েছেন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত আটজনের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন।
ব্যাংককের দুর্যোগ প্রশমন বিভাগের পরিচালক সুরিয়াচাই রাভিওয়ান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে ধোঁয়ায় শ্বাসরোধে। অন্যদিকে ব্যাংককের গভর্নর চাচার্ত সিত্তিপুন্ত বলেন, বারের ছাদে ব্যবহৃত দাহ্য সজ্জাসামগ্রী আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে। জরুরি নির্গমনপথের কাছেও কয়েকজনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেছে। ফলে ওই পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সোমবার সকাল পর্যন্ত পুরো বারটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। ভবনের দেয়াল, ছাদ ও আসবাবপত্র আগুনে পুড়ে কালো হয়ে গেছে। বাইরে সারিবদ্ধভাবে রাখা মরদেহের ব্যাগ এবং ধ্বংসস্তূপ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের নির্মম চিত্র তুলে ধরছে।
থাইল্যান্ডে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। ২০২২ সালে ব্যাংককের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বারে অগ্নিকাণ্ডে ২২ জন নিহত হয়েছিলেন। এরও আগে ২০০৯ সালের নববর্ষ উদ্যাপনের রাতে রাজধানীর একটি নাইটক্লাবে ভয়াবহ আগুনে ৬৬ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। সর্বশেষ এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর দেশটির বিনোদনকেন্দ্রগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আবারও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।


