ব্যাংক খাতে ঋণ নেওয়ার চাহিদা কমে যাওয়া, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে উদ্বৃত্ত তারল্য রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে তা বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। ছয় মাস আগে গত ডিসেম্বরেও উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। আর গত বছরের জুনে ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।
ব্যাংকে এত বিপুল অর্থ পড়ে থাকা অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর নয়; বরং এটি বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতে দুর্বল চাহিদার বড় সংকেত। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের চাপ এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে ব্যাংকে টাকা থাকলেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হচ্ছে না।
এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের গতি যে কতটা কমেছে, এই পরিসংখ্যানই তার বড় প্রমাণ।
ব্যাংক খাতে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু আমানত বাড়ার ফল নয়; দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সমস্যারও প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চিত সরবরাহ, শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিনিয়োগের পরিবেশের অবনতি এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ উদ্যোক্তাদের নতুন ঋণ গ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
ফলে একদিকে ব্যাংকে আমানত জমছে, অন্যদিকে সেই অর্থ ব্যবহার করে নতুন কারখানা, শিল্প বা ব্যবসা সম্প্রসারণের মতো বিনিয়োগ হচ্ছে না। অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কমে গিয়ে ব্যাংকের অর্থ সরকারি বিল ও বন্ডে আটকে থাকার প্রবণতা বাড়ছে।
ভালো ব্যাংকগুলোও বর্তমানে ঝুঁকি কমাতে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। কারণ সরকারি ঋণ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং সময়মতো অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা বেশি। এতে ব্যাংকের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে সরকারের ঋণ চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উদ্বৃত্ত তারল্যের পুরো ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের ভল্টে পড়ে থাকা নগদ অর্থ নয়। এর বড় অংশ বিভিন্ন বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা রয়েছে। ব্যাংকের বাধ্যতামূলক এসএলআর ও সিআরআর সংরক্ষণের পর যে অতিরিক্ত অর্থ থাকে, সেটিই উদ্বৃত্ত তারল্যের অংশ হিসেবে গণ্য হয়। প্রয়োজন হলে বিল ও বন্ড নগদায়ন করে ব্যাংকগুলো এই অর্থ ব্যবহার করতে পারে।
তবে বিপুল এই তারল্য থাকা সত্ত্বেও যদি বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা না বাড়ে, তাহলে তা অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা। কারণ ব্যাংকের অর্থের মূল উদ্দেশ্য হলো উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানো।
বিনিয়োগ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মে মাসে কম সুদের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও ঋণের চাহিদায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
করোনাকালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন ১২টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ৯৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঋণ প্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ২০২১ সালের শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে রেকর্ড ২ লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল।
ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য একদিকে যেমন ব্যাংকের সক্ষমতার ইঙ্গিত দিতে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে এই অর্থ বিনিয়োগে না গেলে তা অর্থনীতির স্থবিরতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট দূর করা না গেলে উদ্বৃত্ত অর্থ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরফান আলীর মতে, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি না হলে উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে আগ্রহী হবেন না। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে বিনিয়োগের চাহিদাও বাড়বে না।


