ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতান্যাহু বলেছেন, বিশ্বের যেসব দেশ ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থন দেখিয়ে আসছে, তাদের মধ্যে ভারত অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে স্বীকার করলেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল একা নয় এবং ওয়াশিংটনের বাইরেও তাদের শক্তিশালী বন্ধু রয়েছে।

রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু এসব মন্তব্য করেন। মূলত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স – এর সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি ভারতের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেন এবং দেশটির প্রতি ইসরায়েলি জনগণের কৃতজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

নেতানিয়াহু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিশ্বের অন্য কোনো শক্তিশালী দেশ তাদের পাশে নেই। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত শুধু জনসংখ্যার দিক থেকেই নয়, কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও একটি বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আর সেই ভারতের জনগণ ও নেতৃত্বের কাছ থেকে ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক সমর্থন পেয়ে আসছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভারত একটি বিশাল দেশ। সেখানে প্রায় ১৪০ কোটির বেশি মানুষের বাস। আমি নিয়মিতভাবে ভারতের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সমর্থনের বার্তা পাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয়দের বিপুল সাড়া আমাকে অভিভূত করে।”

নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। গত এক দশকে ভারত বৈশ্বিক কূটনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে বড় শক্তিগুলোও নয়াদিল্লির ভূমিকা ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতিতে ভারত বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও কৃষিখাতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, অন্যদিকে আরব বিশ্ব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও শক্তিশালী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রেখেছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারত এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা অনেক দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু আরও বলেন, বিশ্বের বহু দেশের নেতা ব্যক্তিগতভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী। নিরাপত্তা, সামরিক কৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা এবং উন্নত প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা নিয়মিত যোগাযোগ করেন বলেও জানান তিনি।

তার ভাষায়, “অনেক নেতা প্রকাশ্যে সব কথা বলতে পারেন না। নিজেদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাদের সীমাবদ্ধ করে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তারা ইসরায়েলের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে সম্মান করেন এবং আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চান।”

প্রযুক্তি খাতে ইসরায়েলের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন নেতানিয়াহু। তিনি দাবি করেন, সাইবার প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ইসরায়েল বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শক্তি। আর এ কারণেই বিভিন্ন দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।

উল্লেখ্য, গত মাসে হোয়াইট হাউসে এক ব্রিফিংয়ে জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, ইসরায়েলের উচিত তাদের “একমাত্র শক্তিশালী মিত্র” যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আক্রমণাত্মক অবস্থান না নেওয়া। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগের সমালোচনার প্রেক্ষাপটে তিনি এ মন্তব্য করেছিলেন।

তবে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান মিত্র হিসেবে দেখলেও বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশের সমর্থনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। বিশেষ করে ভারতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নয়াদিল্লির ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থানেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে জানা গেছে, শিগগিরই ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প- এর সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন নেতানিয়াহু। ইরান, লেবানন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে কিছু মতপার্থক্যের খবর সামনে এলেও, আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে তাদের আলোচনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version