আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

মরিয়মের মৃত্যু কি নিছক আত্মহত্যা, নাকি এর আড়ালে বহুবিবাহ, ক্ষমতার অসমতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নৈতিকতার গভীর সংকট?

একজন সংসদ সদস্য, তার দ্বিতীয় স্ত্রী, তার প্রথম স্ত্রী, একটি সংসদীয় আবাসনের ফ্ল্যাট, একটি ঝুলন্ত মরদেহ, কয়েকটি চিরকুট এবং তার আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা, ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, এটি শুধু একটি মেয়ের করুণ পরিণতির গল্প নয়; এর ভেতরে জড়িয়ে আছে সম্পর্কের ক্ষমতার সমীকরণ, বহুবিবাহের সামাজিক বাস্তবতা, নারীর অধিকার, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব এবং সর্বোপরি আমাদের নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন।

২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। আদালত গাজী নজরুলের চার দিন এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

এই পর্যন্ত ঘটনাটি একটি ফৌজদারি মামলার বিষয়। কিন্তু মরিয়মের মৃত্যু তার চেয়েও বড় একটি সামাজিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। মৃত্যুর আগে মরিয়মের নামে পাওয়া চিরকুটগুলোতে যে ভাষা উঠে এসেছে, তা বিশ্বাসভঙ্গ, অভিমান, প্রতারণা এবং সম্পর্কের গভীর ক্ষতের ইঙ্গিত দেয়। একটি চিরকুটে লেখা হয়েছে, “শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…”। আরেকটিতে বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমে পরাজিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আরও একটি লেখায় নিজেকে ‘অন্য কারো স্বামীকে’ নিজের ‘শখের পুরুষ’ বানানো এক ‘বোকা’ নারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব লেখা সত্যিই মরিয়মের কি না, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আর এখানেই জন্ম নেয় ‘চিরকুট রহস্য’। মরিয়মের মা প্রকাশ্যে বলেছেন, উদ্ধার হওয়া লেখাগুলো তার মেয়ের হাতের লেখা নয়। অন্যদিকে তদন্তে লেখাগুলোর সত্যতা ও উৎস যাচাই করা হচ্ছে। ফলে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিপজ্জনক। যদি এগুলো মরিয়মের লেখা হয়, তবে মৃত্যুর আগে তার মানসিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে। আর যদি তার লেখা না হয়, তবে আরও বড় প্রশ্ন সামনে দাঁড়াবে, ‘কে লিখল’? ‘কেন লিখল’? ‘কার উদ্দেশ্যে লিখল’? কোনো ঘটনার বাস্তবতা আড়াল করার চেষ্টা কি হয়েছিল? নাকি পুরো বিষয়টির পেছনে এমন কোনো তথ্য রয়েছে, যা এখনো আমাদের অজানা?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিজিটাল তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, কল রেকর্ড, ঘটনাস্থলের আলামত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই বের করতে হবে। একটি চিরকুট কখনো আদালতের বিকল্প নয়। একটি ভিডিওও নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা তো আরও নয়। মরিয়মের মৃত্যুর আগে যে সম্পর্কের গল্প সামনে এসেছিল, সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জুনে ষাটোর্ধ গাজী নজরুলের সঙ্গে ১৯ বছরের মরিয়মের সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে আসে। জুলাইয়ে তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। গাজী নজরুল প্রথমে ভিডিওকে ভুয়া বা বানানো বলে দাবি করলেও পরে তাকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়ে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

কিন্তু এখানেই আরেকটি সাংবিধানিক প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। একজন সংসদ সদস্যকে কোনো রাজনৈতিক দল বহিষ্কার করলেই তার সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্যতার নির্দিষ্ট কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নৈতিক স্খলনসম্পৃক্ত অপরাধে আদালতের রায়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডসহ নির্দিষ্ট শর্ত। আর ৭০ অনুচ্ছেদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত কোনো সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু গাজী নজরুলের নয়। প্রশ্নটি আমাদের আইন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থারও।

দলীয় নৈতিকতার মানদণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় আইনের মানদণ্ড কি একই? কোনো রাজনৈতিক দল একজন ব্যক্তিকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বহিষ্কার করলে সেই বহিষ্কারের রাজনৈতিক ও নৈতিক অভিঘাত কতটা? একজন জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত আচরণ কখন শুধু ব্যক্তিগত থাকে, আর কখন তা জনআস্থার প্রশ্নে পরিণত হয়? আরও বড় প্রশ্ন, আইন যদি অপরাধ প্রমাণের জন্য আদালতের রায় চায়, তবে জনজীবনে নৈতিক জবাবদিহির জায়গাটি কোথায়?

এখানে বহুবিবাহের প্রশ্নটিও আসবে। ধর্মীয় ও আইনগত কাঠামোর মধ্যে একাধিক বিয়ের বিষয়টির নিজস্ব বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনো কিছু আইনসিদ্ধ বা ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত হলেই কি তার প্রতিটি প্রয়োগ নৈতিকভাবে প্রশ্নাতীত হয়ে যায়? দুইজন স্ত্রীকে একই সংসারে রাখা আইন, ধর্ম, সামাজিক বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট নারীদের সম্মতির আলোকে কীভাবে মূল্যায়িত হবে? একজন তরুণীর বয়স, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক নির্ভরতা এবং তার নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কতটা ছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর ‘বহুবিবাহ বৈধ কি অবৈধ’ এই সরল বিতর্কে পাওয়া যাবে না। আসল প্রশ্ন হলো সম্পর্কের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য ছিল কি না, সম্মতি ছিল কি না, মর্যাদা ছিল কি না, নিরাপত্তা ছিল কি না।

মরিয়মের বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। তার চেয়ে অনেক বেশি বয়সী একজন পুরুষের সঙ্গে তার বিয়ে কী পরিস্থিতিতে হয়েছিল, পরিবারের ভূমিকা কী ছিল, তার নিজের সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন ছিল এসবও তদন্তের আওতায় আসা উচিত। কারণ কোনো নারী যদি সম্পর্কের মধ্যে নিজের অধিকার, মর্যাদা কিংবা নিরাপত্তা হারিয়ে ফেলেন, তবে সেটি কেবল পারিবারিক সমস্যা থাকে না; সেটি সমাজের আয়নায় আমাদের নিজেদের মুখও দেখায়। আর তাই মরিয়মের মৃত্যু নিয়ে সবচেয়ে সহজ কাজ হবে একটি শব্দ উচ্চারণ করে সব প্রশ্ন বন্ধ করে দেওয়া ‘আত্মহত্যা’!

কিন্তু একটি মৃত্যু ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে নথিভুক্ত হলেই তার আগের দিনগুলোর প্রশ্নগুলো মরে যায় না। কেন একজন তরুণী এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন? তার ওপর কোনো মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন হয়েছিল কি না? সম্পর্কের মধ্যে কোনো চাপ, ভয়, অপমান কিংবা বঞ্চনা ছিল কি না? মৃত্যুর আগে কার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল? কী ঘটেছিল শেষ কয়েক ঘণ্টায়? চিরকুটগুলো তার নিজের কি না? তার ফোন, বার্তা, কললিস্ট ও ডিজিটাল যোগাযোগ কী বলছে? এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে মরিয়মের মৃত্যু আসলে কী ছিল। আর যদি তদন্তে আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা অন্য কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে অপরাধীর পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক মর্যাদা কোনো কিছুই তদন্তের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত নয়।

একইভাবে, যদি তদন্তে অন্য কোনো সত্য সামনে আসে, সেটিও সমান নির্মোহভাবে মেনে নিতে হবে। কারণ ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় শত্রু শুধু অপরাধী নয়, পূর্বধারণাও।

মরিয়ম হয়তো আর কোনো প্রশ্ন করবেন না। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের কাছে প্রশ্ন রেখে গেছে।

একটি তরুণ জীবন কেন এমন প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াল? একটি সম্পর্ক কেন আশ্রয় না হয়ে যন্ত্রণার কারণ হলো? ক্ষমতা কি কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতরেও অসম শক্তির দেয়াল তৈরি করে? আইন কি শুধু অপরাধের শাস্তি দেবে, নাকি ক্ষমতাবানদের নৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নও সমাজের সামনে রাখবে? আর সবচেয়ে বড় কথা, মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত সত্য কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের খুঁজতেই হবে।

মরিয়ম শুধু মারা যাননি। তার মৃত্যু আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ছে। মরিয়ম মরে গিয়ে আমাদের দিকে অনেক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে গেছে। আর সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত একটি মৃত্যুর গল্প কখনো শেষ হয় না।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version