বাংলাদেশে শিশু ও কিশোরদের যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে নতুন একটি বেনামি অভিযোগ প্ল্যাটফর্মে। গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে ‘আওয়াজ ডট বিডি’ চালুর পর মাত্র দুই দিনে সেখানে ৭৮টি যৌন নিপীড়নের ঘটনা বা অভিজ্ঞতার রিপোর্ট জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে কওমি মাদ্রাসা থেকে।
প্ল্যাটফর্মটির তথ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত ২৫টি রিপোর্টের মধ্যে ১৬টি কওমি মাদ্রাসায় সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা ওই শ্রেণির মোট ঘটনার ৬৪ শতাংশ। এছাড়া স্কুলে চারটি, মসজিদে তিনটি এবং ইউনিভার্সিটি ও আলিয়া মাদ্রাসায় একটি করে ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, প্ল্যাটফর্মটির মূল উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলা নয়; বরং দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা শিশু যৌন নিপীড়নের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
শৈশবের নির্যাতনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে
প্ল্যাটফর্মে বেনামে দেওয়া একাধিক বর্ণনায় উঠে এসেছে শৈশবে যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এবং তার দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাবের কথা।
এক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, ছোটবেলায় লজিং হুজুরের কাছ থেকে নিপীড়নের শিকার হওয়ার পর মাদ্রাসার আবাসিক ব্যবস্থায় থাকা বড়দের কাছ থেকেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। পরবর্তী জীবনে বিয়ের পরও সেই শৈশবের ট্রমা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে আসছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বর্তমানে মানসিক সুস্থতার জন্য নিয়মিত সাইকোথেরাপি নিচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেছেন ওই ব্যক্তি।
অন্য এক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাদ্রাসায় থাকার সময় এক বড় শিক্ষার্থীর কাছ থেকে যৌন নিপীড়নের শিকার হন। বিষয়টি বাবাকে জানানোর পর তাঁকে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে আসা হলেও অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।
আরেকজন জানিয়েছেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় আবাসিক প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষক মারধর করে জোরপূর্বক যৌন নিপীড়ন করতেন। ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারেননি তিনি। এখনো এ ধরনের ঘটনার খবর দেখলে শৈশবের সেই ভয়াবহ স্মৃতি ফিরে আসে বলে জানিয়েছেন ওই ভুক্তভোগী।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে ১০ থেকে ১২ বছরের শিশুরা
‘আওয়াজ ডট বিডি’র ৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিল। এই বয়সের ২৫টি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, যা মোট রিপোর্টের প্রায় ৩২ শতাংশ।
এরপর ৭ থেকে ৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ২০টি ঘটনা বা ২৬ শতাংশ রিপোর্ট পাওয়া গেছে। ৪ থেকে ৬ বছর বয়সে আটটি এবং ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সে আটটি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যেও ১০টি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে।
ঘটনার পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ৭৮টি রিপোর্টের মধ্যে ৩৮টি বা ৪৯ শতাংশ ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে আরও ১৫ শতাংশ ঘটনায়।
অপরাধী অনেক ক্ষেত্রেই পরিচিত
রিপোর্টগুলোর তথ্য বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিলেন না।
ছেলে ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে ২১টি ঘটনায় পরিচিত ব্যক্তি অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২টি ঘটনায় বিশ্বস্ত পরিচিত, সাতটি ঘটনায় নিকটাত্মীয় এবং সাতটি ঘটনায় অন্যান্য ব্যক্তি অভিযুক্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে।
মেয়ে ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি- আটটি ঘটনায় দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের কথা বলা হয়েছে। পরিচিত, বিশ্বস্ত পরিচিত ও নিকটাত্মীয়- প্রতিটি শ্রেণিতে তিনটি করে ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে ৭৮টি রিপোর্টের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ ঘটনায় নিকটাত্মীয় জড়িত থাকার তথ্য এসেছে। অর্থাৎ পরিবারের ঘনিষ্ঠ পরিসরও শিশুদের জন্য সবসময় নিরাপদ নয়- এমন একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা উঠে এসেছে এসব বেনামি প্রতিবেদনে।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি রিপোর্ট
জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রিপোর্ট এসেছে ঢাকা থেকে-১৫টি। এরপর চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও নোয়াখালী থেকে পাঁচটি করে ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। বাগেরহাট ও কুমিল্লা থেকে পাওয়া গেছে তিনটি করে রিপোর্ট।
তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, এগুলো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নয়। বরং প্ল্যাটফর্মে মানুষ স্বেচ্ছায় যে অভিজ্ঞতা ও তথ্য জানিয়েছেন, তার ভিত্তিতে তৈরি একটি প্রাথমিক চিত্র। ফলে বাস্তবে যৌন নিপীড়নের ঘটনা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
ক্ষমতার অপব্যবহার বড় ঝুঁকি
ঘটনাগুলো কীভাবে শুরু হয়েছিল, সেটিও বিশ্লেষণ করেছে প্ল্যাটফর্মটি। মোট ৭৮টি রিপোর্টের মধ্যে ৩৩টি ঘটনায় ঘটনার সূচনা কীভাবে হয়েছিল, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে ২৮টি ঘটনায় ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আরও ১৭টি ঘটনায় প্রথমে জোরপূর্বক নিপীড়ন শুরু হওয়ার পর ভয় দেখিয়ে বা আতঙ্কের মধ্যে তা চালিয়ে যাওয়ার তথ্য এসেছে।
শিশুদের ক্ষেত্রে শিক্ষক, বড় শিক্ষার্থী, অভিভাবক বা অন্য কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীলতা তাদের প্রতিবাদ ও অভিযোগ জানানোর সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ঘটনা দীর্ঘদিন গোপন থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।
‘মাদ্রাসা থেকে বের করে দিলেই সমাধান নয়’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শারীরিক ক্ষত অনেক সময় সেরে গেলেও মানসিক আঘাত দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। এর প্রভাব পরবর্তী জীবনে ব্যক্তিত্ব, সামাজিক সম্পর্ক, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক সুস্থতার ওপর পড়তে পারে।
তিনি বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, অল্প জায়গায় অনেক শিশুকে রাখা, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কাজে শিশুদের ব্যবহার এবং সিনিয়রদের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বসবাস- এসব পরিস্থিতি ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অভিযুক্ত কোনো শিক্ষককে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়াকে যথেষ্ট মনে করেন না তিনি। তাঁর মতে, অভিযোগের পর কার্যকর আইনি ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অতীত রেকর্ড যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
সরকার ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি চায় ‘আওয়াজ’
‘আওয়াজ ডট বিডি’র উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান ও সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর। তাঁদের ভাষ্য, একটি যৌন নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে কিছুদিন আলোচনা হয়, পরে তা চাপা পড়ে যায়। তাঁদের লক্ষ্য হলো বিষয়টিকে ধারাবাহিক আলোচনায় রাখা এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ তৈরি করা।
রাকিবুল হাসানের মতে, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও সরকার চাইলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই, অভিযোগের তথ্যভান্ডার এবং কার্যকর নীতিমালা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশু সুরক্ষার জন্য স্বাধীন ও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শিশু যৌন নিপীড়নের মতো গুরুতর অপরাধে নীরবতা যে অপরাধীদের সুরক্ষা দিতে পারে, ‘আওয়াজ ডট বিডি’র উত্থাপিত তথ্য সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। মাত্র দুই দিনে ৭৮টি রিপোর্ট- এটি পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান না হলেও শিশুদের নিরাপত্তা, আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থার নজরদারি এবং অভিযোগের পর কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।


