রাজধানীর মিরপুরে দীর্ঘদিনের পানি সংকট চরম আকার ধারণ করায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। টানা কয়েকদিন ধরে পাইপলাইনে পানি না পাওয়ায় রোববার (২৯ জুন) মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দারা সড়কে নেমে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। এতে এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে অবরোধকারীদের সরিয়ে দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাভারের ভাকুর্তায় অবস্থিত ঢাকা ওয়াসার ওয়েলফিল্ড প্লান্ট থেকে বৃহত্তর মিরপুর অঞ্চলে পানি সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের কথা থাকলেও শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই উৎপাদন ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। সর্বশেষ উৎপাদন নেমে আসে মাত্র ৫ থেকে ৭ কোটি লিটারে। এরই মধ্যে গত ২০ জুন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্লান্টটির পানি উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মিলন জানান, গত ১০ দিন ধরে তাদের এলাকায় পাইপলাইনে একফোঁটা পানিও আসছে না। তিনি বলেন, ওয়াসার আঞ্চলিক কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে ট্যাংকারের মাধ্যমে পানি পাওয়ার জন্য সিরিয়াল নিতে বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও মাত্র একটি ছোট ট্রলি পানি পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন মনিপুর এলাকার বাসিন্দা ওয়াহিদ সাদিক। তিনি বলেন, একদিন ভারী বৃষ্টির পর বাসার চারপাশে পানি জমে থাকলেও ঘরে ফিরে দেখেন পানির লাইনে কোনো সরবরাহ নেই। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
জানা গেছে, মিরপুরে ঢাকা ওয়াসার দুটি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে, একটি মিরপুর বাংলা কলেজ সংলগ্ন এবং অন্যটি মিরপুর-১০ গোলচত্বরের পূর্ব পাশে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৬০০টিরও বেশি পানিবাহী গাড়ির চাহিদা জমা পড়ছে। কিন্তু প্রতিটি কার্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ১০০টি গাড়ির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে অধিকাংশ বাসিন্দাই প্রয়োজনীয় পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে পানির ট্যাংকার সরবরাহ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ওয়াসার এক কর্মকর্তা জানান, সংস্থার কোনো ত্রুটির কারণে গ্রাহকরা পানি না পেলে নিয়ম অনুযায়ী বিনামূল্যে ট্যাংকারে পানি সরবরাহ করার কথা। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, যেখানে এক গাড়ি পানির নির্ধারিত মূল্য ৪০০ টাকা, সেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা ওয়াসা দাবি করছে, রাজধানীতে বর্তমানে কোনো পানি সংকট নেই। সংস্থাটির তথ্যমতে, তাদের দৈনিক পানি উৎপাদন সক্ষমতা ২৯৫ কোটি লিটার, যা দৈনিক চাহিদার তুলনায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি লিটার বেশি।
তবে মিরপুরে চলমান সংকটের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভাকুর্তা ওয়েলফিল্ড প্লান্টের নির্বাহী পরিচালক নাফিস ইমতিয়াজ বিস্তারিত মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২০ জুন যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তবে দুই দিনের মধ্যেই তা সমাধান করা হয়েছে এবং বর্তমানে কোনো সমস্যা নেই।
ঢাকা ওয়াসার জনতথ্য কর্মকর্তা আব্দুল কাদেরও দাবি করেন, বর্তমানে পানির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং চাহিদার চেয়েও বেশি পানি উৎপাদনের সক্ষমতা সংস্থাটির রয়েছে।
তবে ওয়াসার এসব আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের অমিল দেখছেন মিরপুরবাসী। দিনের পর দিন পানি সংকটে ভোগান্তি, ট্যাংকারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত পানি উৎপাদনের কথা বলা হলেও বাস্তবে মিরপুরের বহু এলাকায় এখনও স্বাভাবিক পানি সরবরাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।


