নাহিদ ভূঞার কলাম
সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থা কোনো দলের আনুগত্য বণ্টনের জায়গা নয় বরং রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেধা ও মানবসম্পদ বাছাইয়ের প্রক্রিয়া। অথচ সরকারি চাকরির ১১-২০ গ্রেডের নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার গুরুত্ব কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার ওজন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত বিএনপি সরকার নিয়েছে তাতে নিয়োগব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা শঙ্কিত।
পূর্বে ১১ ও ১২ গ্রেডের পরীক্ষায় ১০ নম্বরের ভাইভা নেয়া হতো, এটি বাড়িয়ে ৫০ নম্বর করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষা ৯০ নম্বরের পরিবর্তে ১০০ নম্বর করলেও লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে।
১৩-১৬ গ্রেডের পরীক্ষায় ১০ নম্বরের ভাইভা নেয়া হতো, এটি বাড়িয়ে ৪০ নম্বর করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষা ৯০ নম্বরের পরিবর্তে কমিয়ে ৬০ নম্বর করা হয়েছে, লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে।
এছাড়া ১৭-২০ গ্রেডের পরীক্ষায় ১০ নম্বরের ভাইভা নেয়া হতো, এটি বাড়িয়ে ২৫ নম্বর করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষা ৪০ নম্বরের পরিবর্তে কমিয়ে ২৫ নম্বর করা হয়েছে।
এসব পরিবর্তনের অর্থ হলো নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফলে পরীক্ষকের ব্যক্তিগত মূল্যায়নের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যে পরীক্ষায় মেধা তুলনামূলকভাবে অধিক যাচাইযোগ্য, সেই পরীক্ষার গুরুত্ব কমছে। বিপরীতে যে পরীক্ষায় মূল্যায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা তুলনামূলক কঠিন, সেটির ক্ষমতা বাড়ছে।
এতে করে শিক্ষার্থীদের মনে প্রশ্ন উঠেছে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার বদলে কি এমন একটি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে পছন্দের প্রার্থীকে শেষ ধাপে এগিয়ে দেওয়া এবং অপছন্দের প্রার্থীকে পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে?
তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা নিজেই স্বীকার করেছেন যে মৌখিক পরীক্ষা বিষয়নির্ভর হওয়ায় সেখানে কারসাজি বা পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ বেশি। তাহলে স্বাভাবিক প্রশ্ন, যে প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সম্ভাবনা বেশি বলে সরকার নিজেই স্বীকার করছে, সেই প্রক্রিয়ার নম্বরই কেন এত বাড়ানো হচ্ছে?
এ দেশের মানুষ বিএনপি আমলে সরকারি চাকরিতে দলীয়করণের দীর্ঘ ইতিহাস দেখেছে। অতীতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের (২০০১-২০০৬) আমলে বিসিএস ও সরকারি চাকরিতে নিয়োগে ব্যাপক জালিয়াতি, প্রশ্ন ফাঁস ও রাজনৈতিক দলীয়করণের ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে। ২৪-তম বিসিএসের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সীমাহীন দুর্নীতির কারণে ২৭-তম বিসিএস পরীক্ষার ভাইভার রেজাল্টও বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। শুধুমাত্র বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকেই ২৫ জন ছাত্রদলের নেতাকর্মীকে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়। হাওয়া ভবনের তালিকায় কয়েক হাজার ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হয় অবৈধভাবে।
প্রহসনের ভাগ-বাটোয়ারার নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে ১৮ মাসে দেড় কোটি কর্মসংস্থানের বাগাড়ম্বর করা বিএনপি সরকার মাত্র ৬ মাসেই ইতিমধ্যে অকল্পনীয় সংকুচিত করে দিয়েছে জীবন-জীবিকার সুযোগ। মাত্র ৬ মাসে বন্ধ হয়ে গেছে ৯৫ কারখানা, বেকার হয়েছে ৬২ হাজার শ্রমিক। গ্যাসের অভাবে সাময়িক বন্ধ আছে প্রায় ৯০০ কারখানা।
উপরন্তু পুরনো ধারা অব্যাহত রেখে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, বোর্ড, করপোরেশন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়োগ দিয়ে ইতিমধ্যে নির্লজ্জ, নগ্ন দলীয়করণের স্বাক্ষর রেখেছে তারেক রহমানের বিএনপি সরকার।
এমন পরিস্থিতিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোতে জনগণের স্বাভাবিক আশঙ্কা আরও জোরালো হচ্ছে যে সরকারি চাকরিতে নতুন করে নগ্ন দলীয়করণের দরজা খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কি বিএনপি?
সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার হওয়া উচিত নয়। এগুলো রাষ্ট্রের মেধাবী সন্তানদের অধিকার। সেই অধিকারকে কোনোভাবেই দলীয় আনুগত্যের কাছে সমর্পণ করা চলবে না।
নাহিদ ভূঞা
১নং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক (৫ আগস্টের পর থেকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ


