অবৈধ ড্রেজিংয়ে বিলীন হচ্ছে নদীর তীর, ঝুঁকিতে অন্তত ২০ গ্রাম; হুমকির মুখে হাওর, কৃষি, পর্যটন ও জীববৈচিত্র্য।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা যাদুকাটা, পাটলাই, ধোপাজান, মাহারাম, শান্তিপুর ও চেলা নদী এখন সংঘবদ্ধ বালুখেকো চক্রের দখলে। আইন, আদালতের নির্দেশনা, প্রশাসনিক অভিযান, স্থানীয়দের আন্দোলন-কোনো কিছুই থামাতে পারছে না অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের এই মহাযজ্ঞ। বরং অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল নজরদারির সুযোগে দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে নদী লুটের সিন্ডিকেট।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি যাদুকাটা নদীতে। একসময় গড়ে ৫৭ মিটার প্রশস্ত এই আন্তঃসীমান্ত নদী এখন কোথাও কোথাও তিন কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। পরিবেশবিদদের মতে, এটি কোনো প্রাকৃতিক পরিবর্তন নয়; বরং বছরের পর বছর অবৈধ ড্রেজিং, নদীর তলদেশ ও পাড় কেটে বালু উত্তোলনের নির্মম পরিণতি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে ড্রেজার, বোমা মেশিন ও সেইভ মেশিন ব্যবহার করে হাজার হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ঘাগটিয়া, মানিগাঁও, লামাশ্রম, রাজাগাঁও, সোহালা, বারিক্কাটিলা, লাউড়েরগড়, বিন্নাকুলি ও গড়কাটিসহ অন্তত ২০টি গ্রাম নদীভাঙনের মুখে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, কৃষিজমি ও গাছপালা। ভাঙনের আতঙ্কে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নিজেদের ঘরবাড়ির নির্মাণসামগ্রী খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।

হুমকির মুখে পড়েছে বিশ্বখ্যাত শিমুল বাগান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, নির্মাণাধীন সেতু এবং বিভিন্ন সরকারি অবকাঠামো। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে হাওরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে তাহিরপুরের পাটলাই, মাহারাম, শান্তিপুর ও ধোপাজান নদীতেও। স্থানীয়দের দাবি, নিষিদ্ধ ড্রেজার বসিয়ে প্রকাশ্যে নদীর তলদেশ কেটে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রতিবাদে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি দেওয়া হলেও বন্ধ হয়নি বালুখেকোদের তৎপরতা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া ছাড়া এত বড় পরিসরে প্রকাশ্যে নদী লুট সম্ভব নয়। প্রতিবাদ করলেই ভয়ভীতি, হামলা কিংবা সামাজিক হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে অনেকেই নীরব থাকতে বাধ্য হন।

যদিও প্রশাসন সময়ে সময়ে অভিযান পরিচালনা করছে, বাস্তবে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও আদালতের নির্দেশনার সীমাবদ্ধতার কথা বলা হচ্ছে, কোথাও আবার জনবল সংকটের কথা তুলে দায় এড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি ড্রেজার জব্দ বা জরিমানা করে একটি সংঘবদ্ধ অবৈধ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়।

এরই মধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পুলিশি তৎপরতা জোরদার এবং কোস্টগার্ড মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে শুধু অভিযান দিয়ে নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এদিকে পাটলাই নদীতে বিআইডব্লিউটিএর টোল আদায় নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের একাংশের অভিযোগ, সরকারি বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলো শুধু বালু-পাথরের উৎস নয়; এগুলো হাওরাঞ্চলের প্রাণ। নদী ধ্বংস হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু সহনশীলতা। তাই অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি, অবৈধ খননযন্ত্র স্থায়ীভাবে জব্দ, পরিবেশ আদালতে দ্রুত বিচার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

নদী বাঁচানো এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনের শাসন, সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষারও প্রশ্ন। এখন দেখার বিষয়, যাদুকাটা থেকে পাটলাই-নদী লুটের এই দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে কি না।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version