আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে ঘিরে বিতর্ক, প্রশংসা, সমালোচনা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ সবকিছুই সমানভাবে প্রবল। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই- তিনি এখনও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে বাংলাদেশ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র। সাম্প্রতিক সময়ে ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে লড়াই করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-কে দেওয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর সেটিই আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খবরটি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের প্রায় সমস্ত সংবাদ মাধ্যমে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ওশেনিয়ার সব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম একযোগে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। ১৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্ম এবং ভিডিও চ্যানেল শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে গুরুত্ব দিয়ে শিরোনাম করেছে।

এই দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে বিশ্বের প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা Reuters, BBC বাংলা, Al Jazeera, Deutsche Welle (DW), Arab News, Yahoo News, Swissinfo, TRT World, RT, U.S. News & World Report, CNBC Singapore, The Hindu, The Indian Express, Hindustan Times, India Today, NDTV, NDTV Profit, Firstpost, News18, Republic World, WION, Moneycontrol, Mint, The Telegraph (India), The Print, Scroll, Outlook India, The Tribune, The Week, Rediff, Business Line, The Federal, Geo News, The Express Tribune, Pakistan Today, Daily Times, Straits Times, Arab News, Astro Awani, News First Sri Lanka, EFE, Modern Diplomacy-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু সুপরিচিত বিখ্যাত সব সংবাদমাধ্যম।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একটি সাক্ষাৎকার বা দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সংবাদ কভারেজ খুবই বিরল। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, অর্থনীতি এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে যুক্ত করেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে তারা মনে করেন।

এই আন্তর্জাতিক আগ্রহের পেছনে রয়েছে শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় তাঁর একচ্ছত্র ভূমিকা। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ, দলকে পুনর্গঠন এবং দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন, এই পরিক্রমা তাঁকে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে যা বিশ্বমিডিয়ার চূড়ান্ত আগ্রহের কারণ।

শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি তৃণমূল পর্যায়ে গড়ে ওঠা সাংগঠনিক ভিত্তি। ওয়ার্ড-ইউনিয়ন থেকে মহানগর, জেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামোয় শেখ হাসিনার নেতৃত্ব এখনও প্রধান ঐক্যের প্রতীক। এই কারণেই দেশে তাঁর প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও তীব্র আগ্রহান্বিত কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও তাঁর সরকারের নীতিগত ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

করোনা মহামারির সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নিয়েও বিশ্বমিডিয়া ইতিবাচক মূল্যায়ন করেন। টিকাদান কর্মসূচি, অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় সরকারের পদক্ষেপ বাংলাদেশকে কঠিন সময় মোকাবিলায় সহায়তা করেছিল।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও শেখ হাসিনা ছিলেন সক্রিয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, ভারতের মত বিশালাকার প্রতিবেশীর সাথে দৃঢ় অবস্থান, আমেরিকার সাথে নীতিগত কাঠামো বাস্তবায়ন, সম্পর্কের ভারসাম্য সকল অক্ষ এবং মিত্রশক্তির সাথে শেখ হাসিনাকে এক মার্জিত বলিষ্ঠ নেতৃত্বের রাজনীতিবিদ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন সহযোগিতা, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং মাথাপিছু উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা তৈরি এবং একটি নিম্নবিত্ত অর্থনীতির দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রুপান্তরের তেজস্ক্রিয়া শেখ হাসিনার হাত ধরেই। জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকের মুহুর্মুহু প্রশংসা অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশের “এইশান রাইজিং টাইগার” উপাধী পাওয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ধরেই। সারবস্তুতে এভাবেই বিশ্বমিডিয়া মনে করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন আলোচ্য এবং অনুকরণীয়।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি ও হামলার মুখোমুখি হয়েছেন, তবুও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামই তাঁকে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনাও রয়েছে। নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পর্যবেক্ষক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে মূল্যায়ন রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গিভেদে ভিন্ন। তবে মিলিত জায়গাটি হচ্ছে শেখ হাসিনার ভূমিধ্বস জনপ্রিয়তা দেশ-বিদেশে।

তবে একটি বাস্তবতা স্পষ্ট, শেখ হাসিনা এখনও বাংলাদেশের এমন একজন রাজনৈতিক নেতা, যাঁর একটি ঘোষণাই বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিতে পারে। রয়টার্সের এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি সংবাদমাধ্যমে সেই খবরের ব্যাপক প্রচার দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ এখনও প্রবল এবং শেখ হাসিনা কেন্দ্রিক। তাই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা বাস্তবে কীভাবে এগোয়, তা এখন শুধু বাংলাদেশের নয়; আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, কূটনৈতিক মহল এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয়।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ার চোখ তাই শেখ হাসিনার প্রতিটি মুভমেন্টেই।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version