ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও সংসদীয় কার্যক্রমে এখনো পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেনি বিএনপি। বাজেট অধিবেশনে দলটির এমপিদের বক্তব্য, মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি, সংসদীয় রেওয়াজ ভঙ্গ, বিল পাসের পদ্ধতি এবং ‘জুলাই সনদ’ ইস্যুতে দলীয় অবস্থানের অসঙ্গতি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা সামনে এসেছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও কার্যকর সংসদ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও কৌশলগত প্রস্তুতির ঘাটতি দৃশ্যমান। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে মন্ত্রী ও সরকারি দলের সদস্যদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার বিষয়টি সংসদের ভেতর-বাইরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
চলমান বাজেট অধিবেশনে বিএনপি জোটের প্রায় ২০০ জন সংসদ সদস্য মোট ৩২ ঘণ্টা ৩ মিনিট বক্তব্য দিলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্যকে বাজেটের মূল বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে দেখা যায়নি। অনেকেই নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন, দলীয় নেতৃত্বের প্রশংসা কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যে বেশি সময় ব্যয় করেছেন।
২২ জুন বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে জামালপুর-২ আসনের এমপি সুলতান মাহমুদ বাবু বাজেটের পরিবর্তে অন্য বিষয়ে বক্তব্য দিলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সরাসরি মন্তব্য করেন যে তিনি বাজেট নিয়ে কোনো কথা বলেননি। অতিরিক্ত সময় দেওয়ার পরও তিনি বাজেটের মূল বিষয়বস্তুতে না গিয়ে দলীয় নেতৃত্বের প্রশংসা করেন, যা সংসদে হাস্যরসেরও জন্ম দেয়।
অন্যদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী নির্ধারিত সময়ের পুরোটা বাজেট বিশ্লেষণে ব্যয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারি দলের ভেতরেও প্রশ্ন উঠেছে। ২২ জুনের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর এমপি সাইফুল ইসলাম খান বিষয়টি স্পিকারের নজরে আনেন।
জবাবে স্পিকার বলেন, বাজেট অধিবেশনে তিনি মন্ত্রীদের আরও বেশি উপস্থিতি দেখতে চান। তিনি উল্লেখ করেন, বাজেট অধিবেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মন্ত্রীদের উপস্থিতি সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করে।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, অনেক মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকলেও সংসদে তাদের উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। তবে বিষয়টি নিয়ে বিরোধী ও সরকারি দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও দেখা যায়।
সংসদীয় গণতন্ত্রে দীর্ঘদিনের একটি রেওয়াজ হলো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য না করা। কিন্তু সেই রেওয়াজ ভেঙে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে।
সংসদীয় কমিটি মূলত নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। ফলে সরকারের একজন সদস্যকে আরেক মন্ত্রণালয়ের তদারকি কমিটিতে যুক্ত করা স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’-এর প্রশ্ন তৈরি করে।
সংসদে বক্তব্য দেওয়ার তালিকা, নামের ক্রম ও সময় নির্ধারণ নিয়েও একাধিক এমপি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কয়েকজন এমপি স্পিকারের আহ্বানের পরও বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং দাবি করেন, তাদের আগেভাগে অবহিত করা হয়নি।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আমান উল্লাহ আমানও জানান, তারা জানতেন না যে তাদের নাম বক্তার তালিকায় রয়েছে। ফলে স্পিকার নাম ঘোষণা করলেও তারা বক্তব্য দেননি।
তবে হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অনেক সদস্যকে একাধিকবার অনুরোধ করার পরও তারা বক্তব্য দিতে দেরি করেন, যার কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি দলের মধ্যেও মতপার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিলেও কয়েকজন এমপির বক্তব্যে ভিন্ন সুর শোনা গেছে।
গাজীপুর-২ আসনের এমপি মঞ্জুরুল করিম রনি সংসদে এ বিষয়কে ‘অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক’ বলে উল্লেখ করলে দলীয়ভাবে ব্যাখ্যা দিতে হয়। একইভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের একটি বক্তব্যও বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে পড়ে।
বিরোধী দলের নারী সদস্যদের পোশাক নিয়ে বিএনপির এমপি মনিরুল হক চৌধুরীর মন্তব্য সংসদে বিতর্ক সৃষ্টি করে। বিরোধীদের আপত্তির মুখে ডেপুটি স্পিকার তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেন।
তবে মনিরুল হক দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য যথাযথভাবে বোঝা হয়নি এবং ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগও তাকে দেওয়া হয়নি। বিষয়টির প্রতিবাদে তিনি সংসদের বৈঠকে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন।
বিভিন্ন বিল পাসের ক্ষেত্রে বিরোধী দল অভিযোগ করেছে যে তাদের পর্যাপ্ত আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী বিলের কপি নির্দিষ্ট সময় আগে সদস্যদের সরবরাহ করার কথা থাকলেও তা সব ক্ষেত্রে মানা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
এ অভিযোগে গত ২৮ জুন বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউটও করে। তবে স্পিকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিরোধী দল বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় তাদের আপত্তি গ্রহণযোগ্য হয়নি।
বিএনপি সরকার বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, কিন্তু সেই শক্তিকে কার্যকর সংসদ পরিচালনায় রূপান্তর করতে এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য বিতর্কে দক্ষতা দেখালেও অধিকাংশ সদস্যকে এখনো সংসদীয় কার্যক্রমে অনভিজ্ঞ ও নিষ্প্রভ মনে হয়েছে।
মন্ত্রীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, সংসদীয় রেওয়াজ মেনে চলা, দলীয় সমন্বয় বাড়ানো এবং বিরোধী দলের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা-এসব ক্ষেত্রেই সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।


