আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত সব চুক্তির তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৬ সালের রাজস্ব স্বচ্ছতা প্রতিবেদনে সরকারি ক্রয়, বাজেট ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহারের প্রশ্নে আপত্তির কিছু নেই। বরং বাংলাদেশের জনগণের অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কার সিদ্ধান্তে ব্যয় হচ্ছে, সেই হিসাব জনগণের সামনে থাকা উচিত। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা নিয়ে ওয়াশিংটন যখন নতুন করে ‘তাগিদ’ দেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে বাংলাদেশকে হিসাব শেখানোর আগে যুক্তরাষ্ট্র কি নিজের সরকারি ব্যয়, সামরিক বাজেট, বিদেশি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিসাব বিশ্বের সামনে দিতে প্রস্তুত?

আর এখানেই বিষয়টি নিছক স্বচ্ছতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ক্ষমতা, কূটনীতি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন।

মার্কিন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বাজেটের তথ্য অনলাইনে প্রকাশ, সরকারি ঋণের তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করা এবং বাজেটে সরকারের আয়-ব্যয়ের মোটামুটি একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরার বিষয়গুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কেন বাংলাদেশ তার সরকারি আয়-ব্যয় হিসাব আরেকটি দেশকে দেবে?

বাংলাদেশকে পুরোপুরি অস্বচ্ছ কিংবা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করার সুযোগ আছে বর্তমান লুটেরা তাবেদারীর সরকারের কারণে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এত আগ্রহ কেন?

সরকারি ক্রয় স্বচ্ছ হোক, বাংলাদেশের জনগণও সেটিই চায়। দুর্নীতি বন্ধ হোক, এটিও জনগণের দাবি। সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার হিসাব হোক, এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু সেই দাবি বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশের জনগণ, আইন, আদালত, সংসদ, গণমাধ্যম ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর। ওয়াশিংটনের অনুমোদন নিয়ে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ার কথা নয়। এটা তো সার্বভৌমত্বের ওপর খড়্গ চালানো!

বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে শুধু একটি কারিগরি সুপারিশ হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আসছে। ফলে বাংলাদেশের মতো একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে ধারাবাহিক মার্কিন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয় যা ভীতিকর।

আজ সরকারি ক্রয়ের হিসাব চাওয়া হচ্ছে, কাল হয়তো বাজেটের নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত, পরশু কোনো প্রকল্প, এরপর কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নীতি, এভাবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও যদি বিদেশি রাষ্ট্রের ‘তাগিদ’ ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: সিদ্ধান্তের মালিক কে? বাংলাদেশের জনগণ, নাকি ওয়াশিংটন?

বাংলাদেশ এখন আমেরিকার সেবাদাস! সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি এখানেই। বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ের হিসাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আগ্রহ অনেকের কাছেই দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন ধরনের নির্ভরতার ইঙ্গিত বলে মনে হতে পারে। একটি স্বাধীন দেশের সরকারি অর্থ কোথায় ব্যয় হবে, কোন প্রকল্প নেওয়া হবে, কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাষ্ট্র চুক্তি করবে এসব বিষয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের মতামত থাকতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থানের দিকে যাচ্ছে, যেখানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপর বিদেশি শক্তির প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে?

ইউনূসের নেতৃত্বাধীন (অপ) অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং তারেক রহমানকে ঘিরে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা আলোচনা রয়েছে।আশঙ্কা, এই ধারার রাজনীতি যদি দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মার্কিন নির্ভরতা তৈরি করে, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ক্রমশ দুর্বলতর হতে পারে। তখন বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।

বাংলাদেশের মানুষ কোনো বিদেশি শক্তির করদ রাজ্য বা পুতুল রাষ্ট্র দেখতে চায় না। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার অর্থই হলো দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এ দেশের জনগণ। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, বাংলাদেশও পাল্টা প্রশ্ন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক ব্যয়, বিদেশে পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক সহায়তা, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ? মার্কিন জনগণের কাছে প্রতিটি সিদ্ধান্তের হিসাব কি একই মাত্রায় উন্মুক্ত?

স্বচ্ছতার মানদণ্ড যদি সর্বজনীন হয়, তাহলে সেটি সবার জন্যই প্রযোজ্য হতে হবে। বন্ধু রাষ্ট্রের জন্য এক নিয়ম, আর ছোট বা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য আরেক নিয়ম, এমন দ্বৈত মানদণ্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা অবশ্যই আরও স্বচ্ছ হতে হবে। সরকারি অর্থের প্রতিটি বড় ব্যয়, প্রকল্প, চুক্তি ও ক্রয়ের তথ্য জনগণের সামনে থাকা উচিত। দুর্নীতি ও অপচয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু এসব করতে হবে বাংলাদেশের জনগণের অধিকার হিসেবে, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নির্দেশে নয়। বাংলাদেশের অর্থের হিসাব চাইবে বাংলাদেশের জনগণ। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো সেই হিসাব নিশ্চিত করবে। সংসদ, আদালত, গণমাধ্যম এবং স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর কার্যকর নজরদারি করবে। ওয়াশিংটন কী বলল, সেটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণের চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। কারণ একটি দেশের সরকারি অর্থের হিসাব জনগণের কাছে দেওয়া দায়িত্বশীল সরকারের কর্তব্য; কিন্তু সেই হিসাব দিতে গিয়ে কোনো বিদেশি শক্তির কাছে রাজনৈতিক জবাবদিহির সম্পর্ক তৈরি হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় স্বচ্ছ হোক, অবশ্যই হোক। প্রতিটি টাকার হিসাব হোক, অবশ্যই হোক। কিন্তু সেই হিসাবের প্রথম দাবিদার বাংলাদেশের জনগণ, যুক্তরাষ্ট্র নয়। আজ যদি বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ের হিসাব নিয়ে ওয়াশিংটন প্রশ্ন তোলে, তাহলে বাংলাদেশেরও প্রশ্ন করার অধিকার আছে, কেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এত আগ্রহ? কোন স্বার্থে? কোন বৃহত্তর কূটনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে? বাংলাদেশকে জ্ঞান দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকেও নিজেদের আয়-ব্যয়, সরকারি ক্রয়, সামরিক ব্যয় ও আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডের হিসাবের দিকে তাকাতে হবে।

বাংলাদেশ কারও সেবাদাস নয়। বাংলাদেশ কারও পুতুল রাষ্ট্র হওয়ার জন্য স্বাধীনতা অর্জন করেনি। ইউনূস কিংবা তারেক রহমান, কোনো ব্যক্তি, কোনো দল কিংবা কোনো বিদেশি শক্তির হাতে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার তুলে দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মালিক বাংলাদেশের জনগণই।

স্বচ্ছতা চাই, জবাবদিহিতা চাই, কিন্তু সেই স্বচ্ছতা হবে বাংলাদেশের জনগণের কাছে, কোনো বিদেশি শক্তির কাছে নয়। বাংলাদেশের জনগণই বাংলাদেশের শেষকথা।।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version