বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, সন্ত্রাসী হামলা ও বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক পুলিশ পরিসংখ্যানেও হত্যাকাণ্ডের উচ্চ হার উঠে এসেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই- ছয় মাসে দেশে ১ হাজার ৮০৫ জন হত্যার শিকার হয়েছেন বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ জন করে মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন।

এর আগে মার্চ থেকে মে- টানা তিন মাসে দেশে ৯১৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে দ্য ডেইলি স্টার। সে হিসাবে ওই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যা মামলা হয়েছে।

শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, প্রকাশ্যে গুলি, সশস্ত্র হামলা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনাও জনমনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাতটি প্রধান অপরাধে ২১ হাজার ৭৫৬টি মামলা হয়েছে, যা আগের ছয় মাসের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে অবশ্য সব অপরাধের প্রবণতা একই রকম নয়। ফেব্রুয়ারি-জুলাই সময়ে হত্যা মামলা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে বলে আরেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নারী ও শিশু নির্যাতন, চুরি ও সিঁধেল চুরির মতো অপরাধ বেড়েছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। খুলনা শহরে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২৪টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ছয়টি লবণচরা থানার এলাকায় ঘটেছে এবং এসব ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কথা জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। একই সময়ে ওই এলাকায় অপরাধমূলক ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষণে রাজনৈতিক বিরোধ, স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, মাদক ব্যবসা, অপরাধী চক্রের সংঘাত এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারকে সহিংসতার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। পুলিশের দুর্বলতা ও অপরাধীদের মধ্যে দণ্ড পাওয়ার ভয় কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো গণপিটুনি ও গণহত্যার প্রবণতা। মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (MSF) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে গণপিটুনিতে অন্তত ৩২ জন নিহত এবং ৭১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আগের মাসে এ ধরনের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল ২১ জন।

এ ধরনের ঘটনা শুধু অপরাধ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় না; একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার কথাও সামনে আনে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য শুধু অভিযান পরিচালনা বা গ্রেপ্তার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, মামলার দ্রুত তদন্ত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে পুলিশের সক্ষমতা ও জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। অপরাধী যে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়েরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করা না গেলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি কঠিন হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version