আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কি কেবল একটি উদ্যান? না। এই মাটির প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে বাঙালির দীর্ঘ স্বাধিকার সংগ্রামের ইতিহাস। এই প্রাঙ্গণেই উচ্চারিত হয়েছিল স্বাধীনতার মহাকাব্যের সেই অমোঘ আহ্বান, এই মাঠেই কোটি মানুষের সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। আবার এই মাটিতেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেছিল। ইতিহাসের নিরিখে এটি তাই শুধু একটি স্থান নয়, এটি একটি জাতির জন্মের জীবন্ত দলিল।

আর সেই ইতিহাসের বুকেই এখন একটি প্রশ্ন দাঁড়িয়ে গেছে, ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থান দুটিতে ভাস্কর্যের পরিবর্তে বসবে পানির ফোয়ারা! বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের মহান ইতিহাস মুছে দিতে আর কী কী করবে!

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, ‘ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ প্রকল্পের পরিধি ও উদ্দেশ্য পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ঐতিহাসিক দুটি স্থানে পরিকল্পিত ভাস্কর্যের পরিবর্তে ওয়াটার ফাউন্টেন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের হলোগ্রাফিক থ্রিডি উপস্থাপনাতেও পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। প্রায় ৩৯৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৪ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৭৫ দশমিক ৯১ শতাংশ বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশ্নটি তাই শুধু একটি ভাস্কর্য থাকবে কি থাকবে না, প্রশ্নটি আরও গভীর। প্রশ্ন হলো, আমরা ইতিহাসকে কীভাবে স্মরণ করতে চাই? ৩০ লাখ নিরীহ নিরন্ন বাঙালীকে নির্বিচারে হত্যা করে যে স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, সেখানে পরাজিত সামরিক শক্তির সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে দৃশ্যমানভাবে সংরক্ষণ করার পরিবর্তে যদি সৌন্দর্যবর্ধনের একটি স্থাপনা বসে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেই স্থানটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য কীভাবে অনুভব করবে? বিএনপির মেটিকুলাস ডিজাইন এবার মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে।

পানির ফোয়ারা নিশ্চয়ই সুন্দর। একটি উদ্যানকে নান্দনিক করে তুলতে ফোয়ারার প্রয়োজনও হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি জায়গার সৌন্দর্য একই ধরনের নয়। কোথাও সৌন্দর্য মানে ফুল, কোথাও বৃক্ষ, কোথাও স্থাপত্য। আর কোথাও সৌন্দর্য মানে স্মৃতি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সৌন্দর্য তার ইতিহাসে, তার রক্তাক্ত অতীতে, তার বিজয়ে, তার আত্মত্যাগে।

এখানে ৭ মার্চের ভাষণ হয়েছিল। এই ভাষণ ছিল বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত সংগ্রামের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এখানেই ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। সেই আত্মসমর্পণ ছিল একটি রাষ্ট্রের পরাজয় এবং একটি নতুন রাষ্ট্রের বিজয়ের প্রতীক লক্ষ প্রাণের ত্যাগের বিনিময়ে।

একদিকে একটি জাতির স্বাধীনতার আহ্বান, অন্যদিকে সেই স্বাধীনতার বিজয়ের দলিল, এই দুই স্থানকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে রাখার মধ্যেই রয়েছে ইতিহাসের এক অসাধারণ ধারাবাহিকতা। তাই সেখানে ভাস্কর্যের পরিবর্তে ফোয়ারা বসানোর প্রস্তাব নিছক স্থাপত্য পরিবর্তন হিসেবে দেখলে হয়তো মূল প্রশ্নটি আড়াল হয়ে যায়।

আরও বিস্ময়ের বিষয়, প্রকল্পের নামই যেখানে ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের দুটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাস্থলের দৃশ্যমান স্মারক নিয়ে কেন এমন পরিবর্তন প্রয়োজন হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানা প্রয়োজন। কারণ রাষ্ট্রীয় অর্থে, রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে এবং রাষ্ট্রীয় ভূমিতে নির্মিত স্মারক কেবল ইট-পাথর-কংক্রিটের স্থাপনা নয়; এগুলো জাতির স্মৃতির অংশ।

আমরা ভুলে যেতে পারি না, ইতিহাস মুছে ফেলার প্রথম ধাপ অনেক সময় ইতিহাসের প্রতীকগুলোকে সরিয়ে দেওয়া। প্রথমে ভাস্কর্য সরানো হয়, তারপর ফলক বদলায়, তারপর ভাষ্য বদলায়, তারপর একদিন নতুন প্রজন্মকে বলা হয় ‘এসবের এত গুরুত্ব কোথায়?’

ইতিহাসকে হত্যা করার জন্য সবসময় বুলেটের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো প্রয়োজন হয় শুধু স্মৃতির জায়গায় অন্য কিছু বসিয়ে দেওয়া। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাটিতে যে ইতিহাস লেখা হয়েছে, তা কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের ইতিহাস। এটি সেই কৃষকের ইতিহাস, যে সন্তান হারিয়েছে। এটি সেই মায়ের ইতিহাস, যে আর কোনোদিন তার ছেলেকে ফিরে পায়নি। এটি সেই মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। এটি সেই ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তের ইতিহাস, যাদের জীবন দিয়ে স্বাধীনতার মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকবে কি থাকবে না, বিএনপি ক্ষমতায় থাকবে কি থাকবে না, কোনো সরকার থাকবে কি থাকবে না এসব রাজনৈতিক প্রশ্নের ঊর্ধ্বে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দেখতে হবে। সরকার বদলাবে, দল বদলাবে, ক্ষমতার চেয়ার বদলাবে; কিন্তু একটি জাতির জন্মের ইতিহাস বদলানো যায় না।

শেখ হাসিনা বহুবার সতর্ক করে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং একাত্তরের অর্জন মুছে ফেলার চেষ্টা হতে পারে। সেই আশঙ্কা নিয়ে তখন রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে, অনেকে বিশ্বাস করেছেন, অনেকে করেননি। কিন্তু আজ যখন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনার নকশা, ভাস্কর্য এবং ঐতিহাসিক উপস্থাপনা পরিবর্তনের প্রশ্ন সামনে এসেছে, তখন অন্তত এটুকু বলা যায় ইতিহাস সংরক্ষণের প্রশ্নটি আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারও রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না। বরং প্রশ্ন করতে হবে একাত্তরের ইতিহাস কি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে? ৭ মার্চের ঐতিহাসিকতা কি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে কমে যাবে? ১৬ ডিসেম্বরের পাকিস্তানি আত্মসমর্পণের তাৎপর্য কি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে মুছে ফেলা সম্ভব?

না, ইতিহাস এত সহজে মুছে যায় না। তবে ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা হলে ইতিহাসের স্মারক দুর্বল হয়ে যায়। আর স্মারক দুর্বল হলে একসময় স্মৃতিও দুর্বল হতে শুরু করে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তাই রক্ষা করতে হবে শুধু একটি পার্ক হিসেবে নয়, একটি জাতির স্মৃতির মানচিত্র হিসেবে। সেখানে ফোয়ারা থাকুক, সবুজ থাকুক, সৌন্দর্য থাকুক; কিন্তু তার আগে থাকুক ইতিহাস। থাকুক ৭ মার্চের অগ্নিঝরা আহ্বানের স্মৃতি। থাকুক ১৬ ডিসেম্বরের সেই অবিস্মরণীয় আত্মসমর্পণের দৃশ্যমান দলিল। থাকুক মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের রক্ত, অশ্রু, বেদনা ও বিজয়ের কথা।

যে জাতি তার বিজয়ের স্থানটিকে ভুলে যায়, একদিন তার বিজয়ের ইতিহাসও অন্যেরা লিখে দিতে শুরু করে। আজ তাই প্রশ্ন একটাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আমরা কি শুধু পানি দেখতে চাই, নাকি পানির স্বচ্ছতার মতোই আমাদের ইতিহাসটাকেও স্বচ্ছ, দৃশ্যমান ও অমলিন দেখতে চাই?

বাংলার মানুষকে এখনই জাগতে হবে। দল-মত-পথের ঊর্ধ্বে উঠে বলতে হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কোনো সরকারের নয়, কোনো দলের নয়। এটি বাংলাদেশের। এটি বাঙালির মুক্তির ইতিহাসের এক অনন্য পবিত্র প্রাঙ্গণ। এই মাটিতে ইতিহাস লেখা হয়েছে রক্ত দিয়ে। সেই ইতিহাসের ওপর সৌন্দর্যের নামে বিস্মৃতির কোনো নতুন স্থাপনা আমরা দেখতে চাই না।

ফোয়ারার আবডালে বিএনপির পাকিস্তান-মানস একদিন শুকিয়ে যাবেই বাঙালির সমারোহে। কিন্তু ৭ মার্চের উচ্চারণ এবং ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় সেগুলো যেন কোনোদিন শুকিয়ে যাবেনা। এখানেই বাঙালির আত্মপরিচয় নিগূঢ় আহ্বানের অনন্য প্রতীতি।।

জয় বাংলা।।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version