বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০ দেশে সাইবার হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উত্তর কোরিয়া-সংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী ‘ওয়াটারপ্লাম’-এর বিরুদ্ধে। জাপানের ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সি (এনপিএ) জানিয়েছে, গোষ্ঠীটি প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইয়েন- প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩৪ কোটি ২০ লাখ টাকার ডিজিটাল সম্পদ চুরি করেছে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এনপিএর এক প্রেস রিলিজ ও চার দেশের সাতটি আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ সাইবার নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)-ও যুক্ত ছিল।

তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ওয়াটারপ্লাম ৩০ হাজারের বেশি ডিভাইসে ম্যালওয়্যার ছড়িয়ে দেয়। এসব হামলার মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাকাউন্টের লগইন তথ্য, পাসওয়ার্ড ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্রেডেনশিয়াল হাতিয়ে নেওয়া হয়।

তদন্তকারীরা বলছেন, হ্যাকারদের কৌশল ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগদাতা বা প্রতিনিধির পরিচয় ব্যবহার করে আইটি পেশাজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। চাকরির আবেদন বা প্রযুক্তিগত অ্যাসাইনমেন্টের নামে প্রার্থীদের কাছে পাঠানো হতো বিশেষ কিছু ফাইল।

দেখতে স্বাভাবিক এসব ফাইলের আড়ালেই থাকত ক্ষতিকর সফটওয়্যার। কোনো প্রার্থী ফাইলটি ডিভাইসে চালু করলেই ম্যালওয়্যার সক্রিয় হয়ে কম্পিউটারে প্রবেশ করত। এরপর ভুক্তভোগীর ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাকাউন্টের লগইন তথ্য চুরি করে তা ব্যবহার করে ডিজিটাল সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হতো।

তদন্তকারীদের ধারণা, অন্তত ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইয়েন মূল্যের ডিজিটাল সম্পদ এমন কিছু ক্রিপ্টো ঠিকানায় স্থানান্তর করা হয়েছে, যেগুলো হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি আপসকৃত বা হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তদন্তে শুধু সাইবার হামলার তথ্যই নয়, উত্তর কোরিয়ার একটি বিস্তৃত বৈদেশিক আয়ের নেটওয়ার্কেরও সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উত্তর কোরিয়া, চীন ও রাশিয়ায় অবস্থানরত উত্তর কোরীয় আইটি কর্মীরা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দূরবর্তী চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজের মাধ্যমে আয় করা অর্থ পরে উত্তর কোরিয়ায় পাঠানো হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গত কয়েক বছরে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশটিতে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

জাপানে কিছু ব্যক্তি কম্পিউটার, সার্ভার, নথিপত্র ও আর্থিক অ্যাকাউন্ট সরবরাহ করে এই নেটওয়ার্ককে সহায়তা করেছিলেন বলেও তদন্তে জানা গেছে। জাপানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব সহায়ক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ওয়াটারপ্লামের ম্যালওয়্যার ছড়ানোর কার্যক্রম এবং উত্তর কোরীয় আইটি কর্মীদের ভুয়া পরিচয়ে চাকরি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্রের প্রমাণও পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

বিশেষ করে ব্যবহৃত কিছু আইপি ঠিকানার মধ্যে মিল পাওয়া গেছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে জাপানের এনপিএ ও এফবিআই ওয়াটারপ্লাম এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে উত্তর কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির অধীন ‘৩১৩ জেনারেল ব্যুরো অব দ্য মুনিনস ইন্ডাস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত বলে শনাক্ত করেছে।

উত্তর কোরিয়া-সংশ্লিষ্ট সাইবার হামলার এই চিত্র এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে হ্যাকিং ও চুরির ঘটনা দ্রুত বাড়ছে।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ইমিউনিফির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ক্রিপ্টো প্রকল্পগুলোতে ২০৭টি হ্যাকিংয়ের ঘটনায় প্রায় ৯৭২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। তাদের ট্র্যাকিংয়ের ইতিহাসে ছয় মাসের হিসাবে এটিই সর্বোচ্চ হামলার সংখ্যা।

মাত্র ছয় মাসে ২০০টির বেশি সাইবার হামলায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাওয়া ক্রিপ্টো খাতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এর আগে লিকুইড নেটওয়ার্কে বড় ধরনের সাইবার হামলার পর প্রায় ৪ হাজার বিটকয়েন হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা সামনে আসে। ওই সময় এসব বিটকয়েনের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ডলার। ঘটনার পর লিকুইড নেটওয়ার্ক তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছিল।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version