দক্ষিণ ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেই ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে স্পেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। দেশটির আন্দালুসিয়া অঞ্চলের আলমেরিয়া প্রদেশে ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া আরও ছয়জন আহত হয়েছেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে দিনরাত কাজ করছেন শতাধিক দমকলকর্মী। পরিস্থিতির অবনতির কারণে প্রায় এক হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্পেনের আন্দালুসিয়া আঞ্চলিক সরকার জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার আলমেরিয়া প্রদেশের লস গাইয়ারদোস এলাকায় দাবানলের সূত্রপাত হয়। প্রবল গরম, শুষ্ক আবহাওয়া এবং তীব্র বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত আশপাশের বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মুহূর্তেই বিস্তীর্ণ এলাকা আগুনের লেলিহান শিখায় গ্রাস হয়।
নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, বিদ্যুতের একটি তার ছিঁড়ে পড়ে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে কী কারণে আগুন লেগেছে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে।
আন্দালুসিয়ার আঞ্চলিক সরকারের প্রধান হুয়ানমা মোরেনো এই ঘটনাকে ‘মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, এই ভয়াবহ ঘটনায় পুরো অঞ্চল শোকাহত।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১৫০ জন দমকলকর্মী নিরলসভাবে কাজ করছেন। পাশাপাশি আগুন নেভানোর অভিযানে স্পেনের সামরিক জরুরি ইউনিট (ইউএমই) মোতায়েন করা হয়েছে। আগুনের বিস্তার ঠেকাতে আকাশপথ থেকেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
আহতদের মধ্যে একজন অতিরিক্ত ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং আরেকজন দগ্ধ হয়েছেন। এছাড়া আরও চারজনকে ঘটনাস্থলেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আগুনের কারণে আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে প্রায় এক হাজার বাসিন্দাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে চলমান তাপপ্রবাহে স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে প্রতিবেশী ফ্রান্স ও পর্তুগালেও বড় বড় দাবানল নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আগেই জানিয়েছিলেন, চলতি গ্রীষ্মে সম্ভাব্য দাবানল মোকাবিলায় দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। তারপরও অস্বাভাবিক গরম ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
ইউরোপীয় বন অগ্নিকাণ্ড তথ্যব্যবস্থার (EFFIS) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর স্পেনে প্রায় ৩ লাখ ৯৩ হাজার হেক্টর বনভূমি দাবানলে পুড়ে যায়, যা ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের গড়ের তুলনায় ছয় গুণেরও বেশি।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে ইউরোপে তাপমাত্রা বিশ্বের গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, পানির সংকট এবং ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ইউরোপে আরও ঘন ঘন এবং আরও ভয়াবহ দাবানলের মুখোমুখি হতে হবে।


