জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৭৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও সামান্য থেকে মাঝারি বৃষ্টিতেই পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করার আশ্বাস দিয়ে নেওয়া বিশাল প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হওয়ার দাবি করা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, কাজের মান এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের তদারকি ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি মাঝারি বৃষ্টির পর খুলনা নগরীর মুজগুন্নী মহাসড়ক, গোবরচাকা, লবণচরা, চানমারী, টুটপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায়। মুজগুন্নী আবাসিক এলাকার বহু বাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ে। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
এই দুর্ভোগ কমাতে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে মুজগুন্নী মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ১১ কিলোমিটার বক্স ড্রেন নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ড্রেনের পানি নিষ্কাশনের জন্য গোয়ালখালী থেকে বাস্তুহারা খাল কংক্রিট দিয়ে পুনর্নির্মাণে ব্যয় হয় আরও প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে এসব অবকাঠামো প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি।
খুলনা সিটি করপোরেশনের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্পের অধীনে ময়ূর নদসহ সাতটি খাল খনন এবং ১৬৯টি ড্রেন পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে প্রকল্পের প্রায় ৮৯ শতাংশ কাজ শেষ এবং ৯০ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের তথ্য দেওয়া হলেও নগরবাসীর অভিযোগ- কাগজে অগ্রগতি থাকলেও বাস্তবে জলাবদ্ধতার চিত্র অপরিবর্তিত।
বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে প্রকল্পটির কার্যকর বাস্তবায়ন, তদারকি এবং অবশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করতে ধীরগতির অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে রূপসা এলাকায় উচ্চক্ষমতার পাম্প স্টেশন নির্মাণ, যা পুরো প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত, সেটির কাজ এখনো শুরু হয়নি। একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও বাস্তব অগ্রগতি না হওয়ায় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য।
কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানিয়েছেন, বাস্তুহারা খালের একটি অংশ ভরাট অবস্থায় রয়েছে এবং রূপসায় পাম্প স্টেশন নির্মাণ না হওয়ায় জোয়ারের সময় বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে নামানো সম্ভব হচ্ছে না। এসব কাজ সম্পন্ন না হলে প্রকল্পের পূর্ণ সুফল মিলবে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। কিন্তু পরদিন সকাল পর্যন্ত মুজগুন্নীসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে ছিল, যা ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই স্পষ্ট করেছে।
মুজগুন্নী আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা জানান, সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়ক ডুবে যায়, বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে এবং নিচতলার ভাড়াটিয়ারা বাসা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও তাদের দুর্ভোগ কমেনি।
বাস্তুহারা খালের ভরাট অংশ কাটার কাজ চলছে এবং ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে। পাশাপাশি রূপসায় পাম্প চালিয়ে পানি দ্রুত নদীতে নামানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য পাম্প স্টেশন নির্মাণ দ্রুত শেষ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও খুলনায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় প্রকল্পের কার্যকারিতা, কাজের মান এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের উন্নয়ন বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।


