হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, নেই পর্যাপ্ত ইঞ্জিন; সড়কে বাড়ছে ব্যবসায়ীদের নির্ভরতা

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথ পাড়ি দিতে একটি মালবাহী ট্রেনের সময় লাগার কথা সাড়ে ৯ ঘণ্টা। অথচ গত ২৮ জুন চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডির উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রেনের গন্তব্যে পৌঁছাতে লেগেছে প্রায় ৭৫ ঘণ্টা। হাসানপুর-নাঙ্গলকোট সেকশনে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর বিকল্প লোকোমোটিভ না থাকায় দীর্ঘ সময় আটকে ছিল ট্রেনটি।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জুন থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৫৩ দিনে ইঞ্জিন সংকটে ৪৯টি পণ্যবাহী ট্রেন মোট ১ হাজার ১৪৭ ঘণ্টা বিলম্ব করেছে। এর ৪০ শতাংশের বেশি ঘটেছে পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে যাত্রীবাহী ট্রেনে যুক্ত করার কারণে। একটি তেলবাহী ট্রেন এভাবে আখাউড়ায় আটকে ছিল ২৯৬ ঘণ্টা- ১২ দিনেরও বেশি।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেলের ১২১টি প্রকল্পে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে ৯৪৮ কিলোমিটার নতুন রেললাইন। অথচ এ সময়ে নতুন ইঞ্জিন কেনা হয়েছে মাত্র ৪০টি। বিপরীতে ৯০টির বেশি পুরনো লোকোমোটিভ বাদ পড়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ৭৭০টি পণ্যবাহী ট্রেন চললেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬৭টিতে। একই সময়ে পণ্য পরিবহন থেকে রেলের আয় ৩৫৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা থেকে নেমে এসেছে ১৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো ইঞ্জিন বরাদ্দ। পণ্য পরিবহনে দৈনিক গড়ে ৯ দশমিক ৯১টি ইঞ্জিন থেকে তা কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ১৪টিতে।

রেলে পণ্য পরিবহন সড়কের তুলনায় সাশ্রয়ী হলেও সময়মতো পণ্য পৌঁছানোর নিশ্চয়তা না থাকায় ব্যবসায়ীরা ট্রাকের দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনে পরিস্থিতি ভয়াবহ। ২০২১-২২ অর্থবছরে রেলে ৫৮৮টি ট্রেনে ২৩ হাজার ৪টি ট্যাংকারে জ্বালানি পরিবহন হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ১২২টি ট্রেনে ৭ হাজার ৪৮০ ট্যাংকারে কমেছে ৮০ শতাংশেরও বেশি।

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের মতে, পুরনো ইঞ্জিন, যন্ত্রাংশের সংকট ও দীর্ঘ ক্রয়প্রক্রিয়া সমস্যার বড় কারণ। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়- দীর্ঘদিন ধরে সংকট জানা থাকার পরও সময়মতো ইঞ্জিন কেনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কেন?

বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হকও মনে করেন, ইঞ্জিন ও রোলিংস্টকের সক্ষমতা না বাড়িয়ে শুধু রেললাইন সম্প্রসারণ করায় ব্যবস্থা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে।

ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থে তৈরি নতুন লাইন পড়ে থাকছে, মালবাহী ট্রেন আটকে থাকছে, ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ছে এবং রেলের আয় কমছে। পরিকল্পনাহীনতা, দীর্ঘসূত্রতা ও সিদ্ধান্তহীনতার এই দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের নীতিনির্ধারণ ও রেল ব্যবস্থাপনার ওপরই বর্তায়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version