২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ ছিল আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম হতাশার অধ্যায়। শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হয় দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে প্রধান কোচের পদ ছাড়েন হোর্হে সাম্পাওলি। একের পর এক বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে হারের পর বিশ্বকাপেও ভরাডুবি- সব মিলিয়ে আর্জেন্টাইন ফুটবলে নেমে আসে গভীর হতাশা। এমনকি জাতীয় দল থেকে অনির্দিষ্টকালের বিরতিও নেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
ঠিক সেই সংকটময় সময়ে এমন একজনের হাতে জাতীয় দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, যার নাম তখন আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে খুব একটা পরিচিত ছিল না। তিনি লিওনেল স্কালোনি। অনেকের কাছেই ছিল এটি বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত। কিন্তু সময়ই প্রমাণ করেছে, আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সেই সিদ্ধান্তই ছিল দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলোর একটি।
২০১৮ সালের ২ আগস্ট আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ স্কালোনিকে জাতীয় দলের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মাত্র কয়েকদিন পরই তিনি লা আলকুদিয়া (কোটিফ) আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দলকে শিরোপা জিতিয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রথম প্রমাণ দেন। এরপর শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।
স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ ছিল ২০১৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর গুয়াতেমালার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে যাত্রা শুরু করা কোচ এখন জাতীয় দলের হয়ে ১০০ ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। বাংলাদেশ সময় গত ৪ জুলাই কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচে ডাগআউটে শততমবার দাঁড়ান তিনি। মজার বিষয়, শততম ম্যাচেও আর্জেন্টিনা জয় পায় তিন গোল করে।
মাত্র ১০০ ম্যাচেই স্কালোনির পরিসংখ্যান ঈর্ষণীয়। তার অধীনে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৭৭টি ম্যাচ, ড্র করেছে ১৪টি এবং হেরেছে মাত্র ৯টিতে। এছাড়া টানা ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার অনন্য রেকর্ডও গড়েছে আলবিসেলেস্তেরা। বিশ্বকাপেও দলটি টানা ১০ ম্যাচ অপরাজিত থেকে নতুন ইতিহাস লিখছে।
তবে স্কালোনির সবচেয়ে বড় অবদান শুধু জয়ের পরিসংখ্যান নয়, বরং ভেঙে পড়া একটি দলকে নতুন করে গড়ে তোলা। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর যখন মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারই অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল, তখন তিনিই অধিনায়ককে জাতীয় দলে ফেরার জন্য রাজি করান। সেই প্রত্যাবর্তনের পর মেসি ও স্কালোনির যুগলবন্দিতে বদলে যায় আর্জেন্টিনার ভাগ্য।
তাদের নেতৃত্বে দীর্ঘ ২৮ বছরের আন্তর্জাতিক শিরোপাখরা কাটিয়ে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার ট্রফি জেতে আর্জেন্টিনা। এরপর ২০২২ সালে ফিনালিসিমা এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৩৬ বছর পর বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে আলবিসেলেস্তেরা। পরবর্তীতে আরও একটি কোপা আমেরিকার শিরোপাও জিতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে দলটি।
শুরুতে অনেকেই স্কালোনির নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অভিজ্ঞতা কম থাকায় তাকে নিয়ে ছিল ব্যাপক সমালোচনা। কিন্তু তিনি কখনো তাড়াহুড়ো করেননি। ধাপে ধাপে দল পুনর্গঠন করেছেন, নতুন ও তরুণ ফুটবলারদের সুযোগ দিয়েছেন এবং একটি ভয়ডরহীন, আক্রমণাত্মক ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তুলেছেন। তার এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর আস্থা রেখেই ২০১৯ সালের আগস্টে এএফএ তাকে স্থায়ী প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপর দুই দফা চুক্তি নবায়ন হয়েছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩১ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার বিষয়েও ইতোমধ্যে মৌখিক সমঝোতা হয়েছে।
বিশ্বজয়ের পরও স্কালোনি নিজেকে কখনো নায়ক হিসেবে তুলে ধরেননি। বরং প্রতিটি সাফল্যের কৃতিত্ব দিয়েছেন নিজের খেলোয়াড়দের। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি খুবই ভাগ্যবান যে এই প্রজন্মের খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ওদের ছাড়া এসব অর্জন সম্ভব হতো না।”
বিশ্বকাপজয়ী কোচদের মধ্যে সবচেয়ে অবমূল্যায়িত নামগুলোর একটি লিওনেল স্কালোনি। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কিন্তু মাঠের ফলাফলই বলে দেয়, আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল কোচে পরিণত হয়েছেন তিনি।
২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে আবারও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে আর্জেন্টিনা। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে শীর্ষস্থান অর্জন করে মূলপর্ব নিশ্চিত করেছে দলটি। এবার লক্ষ্য শুধু বিশ্বকাপ জেতা নয়, বরং শিরোপা ধরে রেখে নতুন ইতিহাস লেখা। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের নেতৃত্বে আছেন সেই মানুষটি, যাকে একসময় অনেকে চিনতেনই না।
অখ্যাত একজন অন্তর্বর্তীকালীন কোচ থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের স্থপতি- লিওনেল স্কালোনির গল্প প্রমাণ করে, সঠিক নেতৃত্ব, ধৈর্য, পরিকল্পনা ও বিশ্বাস থাকলে ব্যর্থতার ধ্বংসস্তূপ থেকেও নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব।


