বরিশালে ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে এক ব্যবসায়ীকে মারধর করে অণ্ডকোষ চেপে ধরে জোরপূর্বক চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায়ের অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির নাম উঠে আসায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৭ জুন সন্ধ্যার পর নগরীর সদর রোড এলাকায় অবস্থিত অগ্রণী (আবাসন) হাউজিং লিমিটেডের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আজিজ হাওলাদারকে তার নিজ কক্ষে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে কয়েকটি চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

শনিবার রাতে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি জনসমক্ষে আসে। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি হঠাৎ করে অফিসকক্ষে প্রবেশ করে আব্দুল আজিজকে ঘিরে ফেলেন। একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হয় এবং জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়। নির্যাতনের সময় তিনি সাহায্যের জন্য চিৎকার করলেও উপস্থিত অন্যদের বাধা দিয়ে বাইরে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে ভিডিওতে দেখা গেছে।

অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নগরীর কাটপট্টি সড়ক এলাকার বাসিন্দা এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার বড় ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি ছিলেন। ঘটনার পর থেকেই লিটুর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, একসময় লিটু আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন। পরবর্তীতে তার বিনিয়োগের বিপরীতে জমি বুঝে নিয়ে বিক্রিও করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে আর কোনো পাওনা নেই বলে লিখিত অঙ্গীকারনামাও দিয়েছেন। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন তিনি। দাবিকৃত অর্থ না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে অফিসে ঢুকে তাকে মারধর করা হয় এবং ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক ও একাধিক স্ট্যাম্পে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অবহিত করায় অভিযুক্তরা চেকের টাকা উত্তোলন করতে পারেননি। পরে আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে কোতোয়ালী মডেল থানাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

অন্যদিকে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু অভিযোগ অস্বীকার না করে দাবি করেছেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন এবং তাদের অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে। তিনি বলেন, পরিচালকরা শিগগিরই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন।

এ ঘটনায় বরিশালজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ব্যবসায়িক বিরোধ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এ ধরনের শারীরিক নির্যাতন ও জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ বিষয়ে কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আল মামুন উল ইসলাম জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুলিশ ঘটনার ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করছে।

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, ব্যবসায়িক বিরোধের আড়ালে যদি চাঁদাবাজি, তোলাবাজি কিংবা প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version