দেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় থাকা ১১৭টি ওষুধের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের দাম যথাযথভাবে সমন্বয় না হওয়ায় এসব ওষুধ উৎপাদনে লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বাপি)। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগীদের ওপর। কম দামের প্রয়োজনীয় ওষুধের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি দামের বিকল্প ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা।

সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাপির কার্যালয়ে ‘ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় সমিতির নেতারা এসব তথ্য তুলে ধরেন।

বাপির নেতারা জানান, বর্তমানে দেশে ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূলত ১৯৯৪ সালের প্রাইসিং কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে। অথচ গত ৩২ বছরে মাত্র দুবার ওষুধের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তাদের দাবি, এ সময়ে মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হার, শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামাল, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দামসহ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে পুরোনো মূল্য কাঠামোয় অনেক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতির সময় ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৯টি ওষুধ উৎপাদনের জন্য নিবন্ধিত হয়নি। ফলে ৯৮টি ওষুধের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারমূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় এসব ওষুধের প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের উৎপাদন বন্ধ থাকায় বাজারে সংকট তৈরি হলে রোগীদের তুলনামূলক বেশি দামের বিকল্প ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার সামগ্রিক ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের জন্য এ ব্যয় আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

বাপির নেতারা মনে করেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হলে শুধু দাম নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; উৎপাদন খরচ ও বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সমিতির নেতারা বলেন, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ, টেকসই ও নিয়মিত সমন্বয়যোগ্য নীতি প্রয়োজন। তাদের মতে, নির্দিষ্ট সময় পরপর মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার, কাঁচামালের দাম, শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন ব্যয়ের পরিবর্তন বিবেচনা করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওষুধের দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত।

সমিতির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাকির হোসেন বলেন, ওষুধ শিল্পকে কেবল মূল্য নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদে তাদের আপত্তি নেই; তবে তালিকা তৈরির সময় যোগ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া এবং মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ সুলভ মূল্যে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। সরকার চাইলে ভর্তুকি অথবা সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে কম দামে ওষুধ সরবরাহ করতে পারে। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের সহায়তা ছাড়া দীর্ঘদিন কম দামে ওষুধ উৎপাদনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

ওষুধ শিল্পে আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট। বাপির মহাসচিব মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, কর্মঘণ্টার বড় একটি অংশে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক কারখানাকে জেনারেটর, বড় ইউপিএস ও বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ওষুধ উৎপাদনের কোনো একটি ধাপ শুরু করার পর মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো প্রক্রিয়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে কারখানাগুলোকে ব্যাকআপ হিসেবে জেনারেটর ও বড় ইউপিএস রাখতে হয়। আবার গ্যাসের সংকটে জেনারেটর চালাতেও ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত ডিজেল সংরক্ষণের সক্ষমতা না থাকায় প্রয়োজনের সময় দ্রুত ডিজেল সংগ্রহ করতে হয়। এতে ব্যয় আরও বাড়ছে।

বাপির নেতারা জানিয়েছেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করার বিষয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে কোন ওষুধ জনগণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এবং কোনগুলো তালিকায় থাকবে- সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসক, ফার্মাসিস্টসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।

তাদের মতে, একদিকে জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে উৎপাদনকারীদের জন্যও এমন মূল্য কাঠামো তৈরি করতে হবে যাতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে না যায়। তা না হলে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট আরও তীব্র হয়ে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বাড়তে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version