দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে গুণীজনদের মর্যাদা, রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা এবং রাষ্ট্রে মেধার মূল্যায়নের প্রশ্ন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ‘অধ্যাপক এমিরেটাস (আজীবন)’ পদ বাতিল এবং গত দুই বছরের প্রাপ্ত বেতন-ভাতা ফেরত চাওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সমাজ ও রাষ্ট্রে কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক পরিবর্তনের পরিবর্তে মতভিন্নতাকে কেন্দ্র করে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। এর ফলে সমাজের গুণী, কৃতী ও মেধাবী ব্যক্তিরা নানা ধরনের চাপ ও হেনস্তার মুখে পড়ছেন। অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহর ঘটনা সেই বাস্তবতারই একটি আলোচিত উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

দীর্ঘ কর্মজীবনে চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় অসামান্য অবদান রাখা অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। যখন অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ভিজিট সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে, তখনও তিনি দীর্ঘদিন তুলনামূলক কম ফিতে রোগী দেখেছেন। ফলে মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

সম্প্রতি বিএমইউ এক অফিস আদেশে তার ‘অধ্যাপক এমিরেটাস’ পদ বাতিল করে এবং ২০২৪ সালের জুন থেকে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা ফেরত চায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্তকে ‘বিধিবহির্ভূত নিয়োগ’ সংশোধনের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও অধ্যাপক আব্দুল্লাহ এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আজীবন সম্মানসূচক পদ বাতিল এবং ইতোমধ্যে পাওয়া অর্থ ফেরত চাওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক ও অসম্মানজনক। তার মতে, এটি একজন শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসকের মর্যাদার পরিপন্থী।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো শিক্ষাবিদ বা গবেষককে এভাবে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসা শুধু ব্যক্তিগত সম্মানহানির বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায় যে, দীর্ঘদিনের অবদান ও সাফল্য রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ ধরনের ঘটনা দেশে চলমান ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধাপাচারকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। ইতোমধ্যেই উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগে দেশের বহু মেধাবী তরুণ বিদেশমুখী। গুণীজনদের প্রতি অবমূল্যায়ন ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হলে দেশের মেধাবী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বিদেশে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মান রক্ষা করা যে কোনো সভ্য সমাজের দায়িত্ব। ক্ষমতার পরিবর্তন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও সেই পরিবর্তনের প্রভাবে গুণীজনদের অবদান প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা দীর্ঘমেয়াদে জাতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

তাদের ভাষ্য, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে না; বরং জ্ঞান, গবেষণা, শিক্ষা ও মানবসম্পদের বিকাশের ওপরও নির্ভরশীল। আর সেই কারণে সমাজের কৃতী ও মেধাবী ব্যক্তিদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই কেবল একজন ব্যক্তির মর্যাদার প্রশ্ন নয়; বরং এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং মেধার মূল্যায়ন নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও গুণীজনদের সম্মান রক্ষায় জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলাই হতে পারে একটি পরিণত ও গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version