ঢাকার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে দেশকে বিদ্যুৎ ঘাটতি থেকে বের করে আনার পর এখন কেন আরও বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন হচ্ছে এ প্রশ্নই সামনে এসেছে।

ঢাকার দীর্ঘদিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকটকে কাজে লাগিয়ে বর্জ্য থেকে কথিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। ৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্পে চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্পটি উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

তবে বিদ্যুতের এই দর নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। কারণ দেশের বিদ্যুৎ খাতে শেখ হাসিনা সরকারের সময় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ঘাটতির দীর্ঘদিনের সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণের ফলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছিল।

সেই ধারাবাহিকতায় ভারতের আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিও করা হয়। আদানির বিদ্যুতের দাম নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও এখন প্রশ্ন উঠছে যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমদানি সক্ষমতা বাড়িয়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলা করেছিল, সেই দেশকে আবার নতুন করে ২৫ টাকা ইউনিট দরে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে কেন?

১৪ টাকা থেকে ২৫ টাকা; দাম বাড়ছে, চাপও বাড়ছে জনগণের ওপর

বর্তমান বিএনপি সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিদ্যুৎ খাতে রাষ্ট্রের ব্যয় আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে জনগণের ওপর বিভিন্ন ধরনের কর, ফি ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ যখন বাড়ছে, তখন উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত সেই চাপ আরও বাড়াবে- তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, জনগণের কাছ থেকে কর ও বিভিন্ন খাতে বাড়তি অর্থ আদায় করে সেই অর্থ দিয়ে কেন তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হবে? বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা, ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনা এবং কার্বন ক্রেডিটের মতো বিষয় প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এমন যুক্তি সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সরকার বলছে, শুধু বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য দিয়ে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, ২৫ টাকা ইউনিট দরের বিদ্যুৎ কেনার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে?

উন্নয়নের বিদ্যুৎ থেকে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ; কেন এই পরিবর্তন?

শেখ হাসিনা সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতে বড় বিনিয়োগ, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। একসময় পূর্বাপর বিএনপি সরকারের সময়ে যেখানে লোডশেডিং ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা, সেখানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণ করা হয়। এখন সেই বিদ্যুৎ খাতেই নতুন করে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার পরিকল্পনা সামনে এসেছে। যে বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সংকট থেকে বেরিয়ে এসেছিল, সেই সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে কেন নতুন করে ২৫ টাকা ইউনিট দরে বিদ্যুৎ কেনার পথে হাঁটছে বিএনপি সরকার?

প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম, চুক্তির শর্ত এবং সরকারের আর্থিক দায় যদি সাধারণ মানুষের ওপর গিয়ে পড়ে, তাহলে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জনগণের ওপর একের পর এক কর ও বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপানোর পরও যদি সেই অর্থ উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার পেছনে ব্যয় হয়, তাহলে এর দায় নেবে কে?

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version