যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার ইউরোপের বাজারেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ২৭ দেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। প্রতিযোগী শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পতনই সবচেয়ে বেশি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিস ইউরোস্ট্যাটের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইইউর বাজারে বাংলাদেশ ৮৬৪ কোটি ৪৮ লাখ ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৭০ কোটি ইউরো।

শুধু বাংলাদেশ নয়, একই সময়ে ইইউর পোশাক আমদানিতেও সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর ক্রেতারা মোট ৪ হাজার ১১০ কোটি ১৭ লাখ ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক আমদানি করেছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আমদানি কমেছে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ।

তবে বাংলাদেশের পতন প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, ভারতের ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ, পাকিস্তানের ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ২১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ১৪ দশমিক ২০ শতাংশ এবং মরক্কোর ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে ভিয়েতনামের রপ্তানি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ।

ইইউর বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বরাবরই শীর্ষে রয়েছে চীন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটি ১ হাজার ১৮২ কোটি ২৬ লাখ ইউরো মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে। তবে চীনের রপ্তানিও আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমেছে।

চীনের পর বাংলাদেশের অবস্থান। এরপর রয়েছে তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া।

তুরস্কের রপ্তানি হয়েছে ৩৭৪ কোটি ৭৩ লাখ ইউরো, ভারতের ২৩৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউরো এবং ভিয়েতনামের ২০৬ কোটি ৫২ লাখ ইউরো।

বিশেষ করে ভিয়েতনামের অবস্থান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য বড় রপ্তানিকারক দেশের তুলনায় দেশটির রপ্তানি প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

ইউরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি- জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৪০০ কোটি ৭৮ লাখ ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার। ফলে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

তবে একই সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ০৮ শতাংশ। কম্বোডিয়ার বেড়েছে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হলেও জোট হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার থেকেই আসে ৬০ শতাংশের বেশি পোশাক রপ্তানি আয়।

ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র- দুই গুরুত্বপূর্ণ বাজারেই রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রবণতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও সামগ্রিক রপ্তানি খাতের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা তুলে ধরেছেন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান।

তার মতে, ইউরোপের বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে পোশাকের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি চীন আগ্রাসী বিপণনের মাধ্যমে ইউরোপে ক্রয়াদেশ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সম্পর্কের অগ্রগতির কারণে কিছু ক্রয়াদেশ ভারতের দিকে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও রপ্তানি খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের নানা সমস্যা এবং ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কারখানাগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের একটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে পণ্যের গড় রপ্তানি মূল্য।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ ইইউতে ৬২ কোটি ৩০ লাখ কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে চীন রপ্তানি করেছে ৫৯ কোটি ৬২ লাখ কেজি। অর্থাৎ পরিমাণের হিসাবে বাংলাদেশ চীনের চেয়েও বেশি পোশাক রপ্তানি করেছে।

কিন্তু মূল্যের হিসাবে চীন বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। জানুয়ারি- জুন সময়ে চীন প্রতি কেজি পোশাক গড়ে ১৯ দশমিক ৮৩ ইউরোতে রপ্তানি করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ প্রতি কেজি পোশাক রপ্তানি করেছে মাত্র ১৩ দশমিক ৮৮ ইউরোতে।

বাংলাদেশের এই গড় রপ্তানি মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে চীনের গড় রপ্তানি মূল্য কমেছে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাকের পরিমাণ বেশি হলেও তুলনামূলক কম দামে রপ্তানি হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে না।

বিশ্বের পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি কম খরচে বড় পরিমাণে উৎপাদনের সক্ষমতা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর বাজার সম্প্রসারণ, ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version