বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) তাদের বিভিন্ন নীতিগত নথি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দের পরিবর্তে শুধু ‘প্যাসিফিক’ ব্যবহার শুরু করেছে। সরকারিভাবে এ পরিবর্তনকে কেবল নামের সংশোধন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও, অনেকের মতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
যদিও নতুন নামকরণের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দায়িত্বের ভৌগোলিক পরিধিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে ভারতের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল এখনও মার্কিন প্যাসিফিক কমান্ডের আওতাতেই রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতীক ও পরিভাষারও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। একটি শব্দের পরিবর্তন অনেক সময় ভবিষ্যৎ নীতির দিকনির্দেশনা প্রকাশ করে।
‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাটি কেবল একটি ভৌগোলিক নাম ছিল না; এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এই ধারণার মাধ্যমে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরকে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত নৌপথ, দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের এলাকাগুলোকে একই কৌশলগত কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছিল।
এই ধারণার অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। তিনি ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ (Free and Open Indo-Pacific) ধারণা তুলে ধরে বলেছিলেন, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর এখন একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। তাঁর লক্ষ্য ছিল কোনো একটি দেশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ঠেকিয়ে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং সমুদ্রনির্ভর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদে এই কৌশলই যুক্তরাষ্ট্রের চীন নীতির ভিত্তি হয়ে ওঠে। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত কোয়াড (Quad) জোটকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। পাশাপাশি চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই কৌশলে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, কারণ ভারতকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি এবং জাপানকে পূর্বাঞ্চলীয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় এসেও মূলত একই কৌশল অনুসরণ করেন। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নিলেও, ওয়াশিংটনের নীতিতে চীনই ছিল দীর্ঘমেয়াদি প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অবস্থানকে ঘিরে বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁদের মতে, ট্রাম্প এখন চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে কোয়াড জোটের সক্রিয়তাও আগের তুলনায় কমে এসেছে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে ‘জি-২’ (G-2) ধারণা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে বিশ্বের প্রধান দুই পরাশক্তি হিসেবে যৌথভাবে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারণা বাস্তবায়িত হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের জোটভিত্তিক নিরাপত্তা কৌশল থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
পেন্টাগনের এই নাম পরিবর্তন হয়তো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। এটি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের পূর্বাভাস হতে পারে। বিশেষ করে ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য এই পরিবর্তন নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ‘ইন্দো’ শব্দটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল একটি নাম পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অগ্রাধিকার, চীনকে ঘিরে নীতি এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই পরিবর্তন কেবল প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি আগামী দিনে তা যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক ও নিরাপত্তা নীতিতে আরও বড় পরিবর্তনের রূপ নেয়।


