খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের সংকট সামনে রেখেই সরকারের ১,২৭৬ কোটি টাকার প্রকল্পে বড় বরাদ্দ প্রযুক্তি-পরামর্শক খাতে

দেশের ব্যাংক খাত যখন খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং মূলধন ও তারল্য সংকটের মতো সমস্যায় চাপে, তখন এসব সংকট মোকাবিলায় ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প নিয়েছে সরকার। ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ নামে পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের ১ হাজার ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা আসবে প্রকল্প ঋণ হিসেবে, আর ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা দেবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো নিয়ে। কারণ ব্যাংক খাতের মৌলিক সংকট হিসেবে খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা হলেও প্রকল্পের বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রযুক্তি, সফটওয়্যার, পরামর্শক ও প্রশিক্ষণের পেছনে। প্রকাশিত প্রকল্প তথ্য অনুযায়ী, এসব কয়েকটি খাতেই প্রায় ১ হাজার ২৪০ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের নেওয়া এ প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে পরামর্শক নিয়োগের বরাদ্দ। প্রকল্প নথি অনুযায়ী, ব্যক্তি পরামর্শকের জন্য ২৯ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শকের জন্য ৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ দুই ধরনের পরামর্শক মিলিয়ে ব্যয় হবে ৯৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা। ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৫৩ জনমাস এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শকের জন্য ছয়টি চুক্তির সংস্থান রাখা হয়েছে।

ব্যাংক খাত আধুনিকায়নের নামে প্রকল্পের বড় অর্থ যাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোতে। শুধু আইসিটি সরঞ্জাম কেনায় ৭১১ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং কম্পিউটার সফটওয়্যারে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। দুই খাত মিলিয়ে প্রযুক্তি কেনাকাটাতেই যাচ্ছে ১ হাজার ৬৭ কোটি টাকার বেশি।

প্রকল্পে ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্যও রাখা হয়েছে ৭০ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রকল্প ঋণ থেকে ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৩ কোটি টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে।

সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য- দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো শক্তিশালী করা, আমানতকারীদের সুরক্ষা বাড়ানো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা উন্নত করা। কিন্তু প্রকল্পের অর্থ কোথায় কতটা যাচ্ছে, সেই হিসাবই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

বিশেষ করে খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক খাতের সুশাসনের সংকট চিহ্নিত করার পরও সরাসরি সেই সংকট মোকাবিলায় তুলনামূলক কম বরাদ্দ কেন- এ প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে। কারণ প্রকল্পের প্রায় পুরো অর্থ যদি প্রযুক্তি, পরামর্শক ও প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়, তাহলে বাস্তবে দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি ও জবাবদিহি কতটা শক্তিশালী হবে, সেটিই হবে প্রকল্পটির বড় পরীক্ষা।

অর্থাৎ, ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের সংকটের দায় ও সংস্কারের দায়িত্ব এখন সরকারের কাঁধেই। বিশ্বব্যাংকের ঋণে পরিচালিত এই প্রকল্পে প্রতিটি টাকা কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, পরামর্শক নিয়োগের যৌক্তিকতা কী এবং পাঁচ বছর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ, সুশাসন ও তদারকিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন কতটা এসেছে- এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version