অস্তিত্বা সরকারের খোলা চিঠি
আজ ২৮ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া একজন নারী কীভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘতম, সবচেয়ে আলোচিত এবং সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের এক অবিচ্ছেদ্য চরিত্র হয়ে উঠলেন, সেই ইতিহাস একদিন ইতিহাসবিদেরা লিখবেন। তাঁর শাসনের সাফল্য ও ব্যর্থতা, অর্জন ও বিতর্ক, প্রশংসা ও সমালোচনা, সবকিছুরই বিচার হবে সময়ের আদালতে। কিন্তু আজ আমি রাজনীতির হিসাবের খাতা খুলতে চাই না। আমি রাজনীতি বুঝিওনা। আমি একজন মেয়ে, নারীর সুকোমল প্রবৃত্তির ধাঁচে জানাই একজন মহীয়সী নারীর প্রতি নারী হিসেবে কৃতজ্ঞতা। আজ আমি একজন নারী হিসেবে আরেকজন নারীকে শুধু একটি কারণে ধন্যবাদ জানাতে চাই, রাষ্ট্রের ক্ষমতার অলিন্দে নারীর পদচিহ্ন আরও স্পষ্ট এবং দৃশ্যমান করার জন্য।
বাংলাদেশের নারীরা কখনোই অক্ষম ছিলেন না। সুযোগের অভাব ছিল, দরজার সংখ্যা ছিল কম, আর সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল প্রভুত্ব পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দীর্ঘ প্রাচীর। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক সময়কালে রাষ্ট্রের সেই প্রাচীরের বেশ কিছু জায়গায় ফাটল ধরেছিল। সেই ফাটল দিয়ে একের পর এক নারী উঠে এসেছেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার হয়েছেন। সাহারা খাতুন দেশের প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। ডা. দীপু মনি হয়েছেন দেশের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম হয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য। নাজমুন আরা সুলতানা হয়েছেন দেশের প্রথম নারী বিচারপতি, পরে আপিল বিভাগের প্রথম নারী বিচারপতি। ডা. সুসানে গীতি হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম নারী মেজর জেনারেল। এগুলো কেবল কয়েকটি নিয়োগের নাম নয়; এগুলো বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য একেকটি প্রতীকী দরজা খোলার গল্প।
একটি মেয়ে যখন দেখেছে সংসদের সর্বোচ্চ আসনে একজন নারী বসতে পারেন, তখন তার স্বপ্নের আকাশ একটু বড় হয়েছে। একজন ছাত্রী যখন দেখেছে একজন নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে পারেন, তখন তার নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কল্পনাটাও একটু বদলেছে। একজন তরুণী যখন দেখেছে একজন নারী সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল হতে পারেন, তখন হয়তো তার মনে হয়েছে, রাষ্ট্রের শক্তির জায়গাগুলোও শুধু পুরুষের জন্য সংরক্ষিত নয়। এই পরিবর্তনের সমস্ত কৃতিত্ব একজন মানুষকে দিয়ে দেওয়া ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। বাংলাদেশের অসংখ্য নারী বছরের পর বছর সংগ্রাম করেছেন। নারী অধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক পরিবর্তন সবকিছুর সম্মিলিত পথ পেরিয়েই এই জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে শেখ হাসিনার শাসনামলে রাষ্ট্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্তরে নারীর দৃশ্যমান উত্থান ঘটেছে। তাই আজ একজন নারী হিসেবে আমার কৃতজ্ঞতা থাকতেই পারে।
কিন্তু এই জায়গাতেই আমার আরেকটি প্রশ্ন আছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে জঙ্গী হামালার আগে ও পরে বহু নারী শেখ হাসিনার বিরোধিতা করেছেন। আন্দোলন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর সরকারের সমালোচনা করেছেন। এসব তাঁদের অধিকার। গণতন্ত্রে কোনো নারী প্রধানমন্ত্রীও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতা আর নারীবিদ্বেষ এক জিনিস নয়। কোনো নারী রাজনীতিকের নীতি, সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার ব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক দর্শনের সমালোচনা করা এক ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য। আর তাঁকে অপমান করতে তাঁর নারী পরিচয়, শরীর, যৌনতা কিংবা নারীত্বকে অস্ত্র বানানো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সংস্কৃতি।
দুঃখজনক হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই সীমারেখাটি বারবার মুছে দেওয়া হচ্ছে। একজন নারী যখন আরেকজন নারীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তি ছুড়ে দিন, তথ্য ছুড়ে দিন, ইতিহাস ছুড়ে দিন, প্রশ্ন ছুড়ে দিন। কিন্তু একজন নারীকে অপমান করার জন্য নারীত্বকেই কেন অস্ত্র বানাতে হবে? যে ভাষা একজন নারীকে তার শরীরের কারণে অপমান করে, সেই ভাষা কোনো দলের নয়, কোনো মতাদর্শের নয়, কোনো আন্দোলনের নয়। সেটি আসলে সেই পুরোনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভাষা, যে সমাজ নারীর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে প্রথমে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তারপর তার শরীর নিয়ে কথা বলে।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো কখনো কখনো সেই ভাষার বাহক হয়ে ওঠে নারীরাই। এখানেই আমার কষ্ট। যে নারীরা নিজের অধিকার, স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সমতার জন্য লড়াই করেন, তাঁরা যখন আরেক নারীর রাজনৈতিক পরিচয়কে আক্রমণ করতে তাঁর নারীত্বকে অপমানের হাতিয়ার বানান, তখন প্রশ্ন জাগে আমরা আসলে কোন সমাজের বিরুদ্ধে লড়ছি? নারীর স্বাধীনতার জন্য? নাকি শুধু নিজের পছন্দের নারীর স্বাধীনতার জন্য? কারণ নারীবাদ যদি হয় ‘আমার পক্ষে থাকা নারী সম্মানের, আর আমার বিপক্ষে থাকা নারী অপমানের যোগ্য’, তাহলে সেটি নারীবাদ নয়; সেটি রাজনৈতিক পক্ষপাত।
আজ শেখ হাসিনাকে ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা করার প্রশ্ন আমি তুলছি না। আমি শুধু বলছি, ইতিহাসকে তার পূর্ণতা নিয়ে দেখতে শিখুন। যে নারীকে আপনি রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন, তাঁর সময়েই হয়তো কোনো এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে প্রথমবার বিশ্বাস করতে শিখেছে একদিন সেও রাষ্ট্রের বড় কোনো চেয়ারে বসতে পারে। যে নারীকে আপনি রাজনৈতিকভাবে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন, তাঁর সময়েই হয়তো কোনো মা তাঁর মেয়েকে বলেছে ‘তুমিও বড় হয়ে অফিসার হতে পারো।’ রাজনীতি মানুষকে বিভক্ত করে। ইতিহাস কখনো কখনো সেই বিভাজনের ওপরে দাঁড়িয়ে কিছু দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের সাক্ষ্য রেখে যায়।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মূল্যায়ন ইতিহাস করুক। আদালত করুক। গবেষকরা করুন। সমালোচকেরা করুন। সমর্থকেরা করুন। কিন্তু নারী হিসেবে তাঁর একটি উত্তরাধিকারকে অন্তত অস্বীকার করবেন না বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বহু গুরুত্বপূর্ণ দরজায় নারীর প্রবেশকে তিনি দৃশ্যমান করেছেন।
আর আজ তাঁর জন্মদিনে, সেই জায়গা থেকেই একজন নারী হিসেবে আমার ছোট্ট কথাটি ”ধন্যবাদ শেখ হাসিনা”। আপনার সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমার একমত হতে হবে না। আপনার সব রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করতেই হবে এমনও নয়। কিন্তু যে বাংলাদেশের মেয়েরা আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরে নিজেদের কল্পনা করতে পারে, তাদের সেই স্বপ্নের ইতিহাসে আপনার সময়ের কিছু পৃষ্ঠা যে লেখা আছে, সেটি মুছে ফেলা যাবে না।
আর যারা একজন নারীকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করতে গিয়ে নারীত্বকেই অপমানের ভাষা বানান, তাঁদের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন, আপনি কি সত্যিই নারীর মুক্তি চান, নাকি শুধু আপনার পছন্দের নারীর মুক্তি চান? কারণ একজন নারীকে অপমান করার সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত কোনো একজন নারীকে আঘাত করে থামে না। সেই আগুন একদিন ঘুরে ফিরে আমাদের ঘরেই আসে। ইতিহাসের চাকা অদ্ভুত। ক্ষমতা বদলায়। শাসক বদলায়। স্লোগান বদলায়। কিন্তু অন্যায় ভাষার স্মৃতি থেকে যায়। আর তখন খুব নিঃশব্দে মনে পড়ে যায় সেই পুরোনো কথাটি ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’
অস্তিত্বা সরকার
নবম শ্রেনী, যশোর


